পৃথিবীর আর কোথায় আছে?
‘আমার কাছে বাংলাদেশ মানেই ঢাকা’

এক যুগের বেশি সময় ধরে বিদেশ-বিভুঁইয়ে থেকে ঢাকা নিয়ে এখন কথা বলা মানেই পুরনো সব ঘটনা মনে করে জাবর কাটা। নতুন স্মৃতি হচ্ছে কই যে সে নিয়ে কথা বলব? আমার কাছে বাংলাদেশ মানেই ঢাকা। বিদেশ থেকে যখনই কেউ বাংলাদেশে যায়, তাদের কমবেশি সবাই বলে, ‘দেশে যাচ্ছি।’ কিন্তু আমি বলি, ‘ঢাকায় যাচ্ছি।’ কারণ, নানাবাড়ি-দাদাবাড়ি ঢাকাঘেঁষা হওয়ায় আমার তো ঢাকার বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না বললেই চলে। তাই আমার সবটা জুড়েই ঢাকা। এবার প্রশ্নটা যদি হয়, ‘ঢাকার কী মিস করি?’ উত্তরটা সাদাসিধে খুব— আমি ঢাকার সবটাই মিস করি! যে শহরে আমার শৈশব, কৈশোর কেটেছে, কাটিয়েছি টগবগে ২৭টি বছর, সে শহর নিয়ে রোমন্থন করার মতো স্মৃতির কমতি তো নেই!
সেই নব্বইয়ের ঢাকা, ২০০০-এর শুরু এবং তার পরবর্তী ঢাকা— সময়ে-অসময়ে, কারণে-অকারণে কত যে পাল্টেছে! পৃথিবীর অন্য যেকোনো বড় শহরের মতোই ঢাকারও পরিবর্তন হয়েছে। সুইস থেকে ক্যাফে ম্যাঙ্গো, নীলক্ষেত থেকে বেঙ্গল বুক; এখন তো কিনোকুনিয়াও। আজাদ প্রোডাক্টস কি এখনো ‘ঈদ মুবারক’ লিখে কার্ড ছাপায়? আমার কিন্তু ‘চকবার’-এর চেয়ে ‘শেল অ্যান্ড কোর’ বেশি ভালো লাগত। ফুচকা-ঝালমুড়ি এখন আর টানে না তেমন। এমনও যে হতে পারে কোনোদিন, কে ভেবেছিল? অন্তত আমি তো না!
বিদেশ থেকে যখনই কেউ বাংলাদেশে যায়, তাদের কমবেশি সবাই বলে, ‘দেশে যাচ্ছি।’ কিন্তু আমি বলি, ‘ঢাকায় যাচ্ছি’
একসময় ঢাকার কী কী মিস করি, সে তালিকা শেষ হওয়ার ছিল না। বারো বছরের অনেক বেশি সময়ে কত স্বাদ আর অভ্যাসই না পাল্টেছে! তাই তালিকাও একদিকে কমেছে, তো বেড়েছে অন্যদিকে। তবে কিছু জিনিস ছাড়া। দোয়েল চত্বরের মাটির জিনিসপত্র, বইমেলা, তাঁত আর জামদানি শাড়ির মেলা, বেইলি রোডের আড্ডা, নীলক্ষেতে বই খোঁজা আর দোলনচাঁপা। আরও মিস করি মোড়ের চায়ের দোকানের আড্ডা এবং ঢাকার রাস্তার বাহারি খাবার। ভীষণ মিস করি ঢাকার রাজপথে রিকশাযাত্রা। ‘রিকশা কেন আস্তে চলে না?’ আমার জানা নেই; কিন্তু মনে পড়ে সঞ্জীব চৌধুরীকে।
আহা, দীর্ঘশ্বাস! কী মনে করে? আব্বুর হাত ধরে শিশুপার্ক আর জাদুঘরে বেড়াতে যাওয়ার দিনটা—এখনো মনের ভেতরে কী তাজা! আম্মুর সঙ্গে ঈদের কেনাকাটা, বোনের সঙ্গে রাত জেগে বই পড়া, ভাইয়ের কাছে চকলেটের আবদার— এসবই ঢাকায় ঘটে যাওয়া আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর সময়।
মাঝেমধ্যে ভাবি, ঢাকায় থাকলেও কি আমাকে পুরনো সব স্মৃতি এমনভাবে তাড়া করে ফিরত? হয়তো না। কারণ আমার তালিকার অনেক কিছুই এখন আর আগের মতো নেই ঢাকায়। কিন্তু আমার স্মৃতিতে আছে। ঢাকায় থাকলে পরিবর্তনগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে যেতাম হয়তো। এতটা তাড়িত হওয়ার সুযোগ কি পেতাম আদৌ?
লেখক: জার্মান প্রবাসী এই বাংলাদেশি ঘুরে বেড়িয়েছেন এশিয়া ও ইউরোপের ১৬টি দেশ





