বিশ্বকাপ কি জীবনের চেয়েও মূল্যবান

ফুটবল বিশ্বকাপ পৃথিবী জুড়েই এক বড় উৎসব। যেখানে জাতিসংঘের সদস্য দেশ ১৯৩টি, সেখানে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সদস্য দেশ ২১১টি। যারা এখনো জাতিসংঘের কাছে স্বীকৃতি পায়নি, ফিফা তাদেরও সাদরে বরণ করে নিয়েছে এই মহাযজ্ঞে। ফলে বিশ্বকাপের এই রঙ্গমঞ্চে ‘শক-হুন, দল-পাঠান-মোগল এক দেহে হলো লীন’। ধনী-গরিব, উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে চর্মগোলকের জনপ্রিয়তা অবিসংবাদিত। বাংলাদেশ সময় গত ১২ জুন শুরু হওয়া ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ শেষ হবে ২০ জুলাই।
নানাদিক থেকেই এবারের আসরটি অনন্য। ২০২৬ বিশ্বকাপেই প্রথমবার আয়োজক দেশ তিন এবং অংশগ্রহণকারী দেশ ৪৮টি। এ ছাড়াও টিকিট, আবাসন ও যাতায়াতের উচ্চমূল্য, ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ফ্রান্সের আপত্তিতে হাইতিকে জার্সি বদলে বাধ্য করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ— সব মিলিয়ে ইউএস-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপ এক অম্লমধুর অভিজ্ঞতা হয়েই থাকবে।
বাংলাদেশেও চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপকে বরণ করা হয় বহুমাত্রিক আয়োজনে, যেটা অনেক ক্ষেত্রেই বর্ণিল উৎসবে রূপ নেয়। উদযাপনের অংশ হিসেবে মোটরবাইক শোভাযাত্রা, পদযাত্রা, কুইজ প্রতিযোগিতা, বড় পর্দায় খেলা দেখা, ভোগ্যপণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের সঙ্গে বাহারি উপহার দেওয়া— এই ৩০-৪০ দিন সাধারণ মানুষ যেন নিত্যদিনের অভাব-অভিযোগ ভুলে শুধুই আনন্দে মেতে থাকে।
বিশ্বকাপের অর্থনীতিটাও নেহাত কম বড় নয়। টিভি-ওটিটিতে সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি নিয়েও যথেষ্ট রশি টানাটানি হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, উত্তর আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য। খেলা শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা-সকাল ১০টার মধ্যবর্তী সময়ে। ফলে মধ্যরাত বা ভোররাতেও শুরু হচ্ছে বেশ কিছু খেলা। জার্সি, পতাকা, স্যুভেনির ছাড়াও সাবান, শ্যাম্পু, চা, কফিও এখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার রঙে রাঙিয়েছে নিজেদের। সঙ্গে নানা কাস্টমাইজড বিলাসী পণ্য তো আছেই।
ফুটবল যেন কারও প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়। উদযাপন যদি উন্মাদনায় রূপ নেয়, তাহলে তা ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে
মেট্রোপলিটন-নগর-বন্দর পেরিয়ে উত্তেজনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লায়। চায়ের টঙ থেকে অভিজাত ফাস্টফুড-রেস্তোরাঁ-কফিশপ সব জায়গা বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে। বাসা, বাজার, বাচ্চার স্কুল, অফিস, রাস্তাঘাটে ছোট-বড় জটলার পাশ দিয়ে গেলেই শোনা যায় মেসি-এমবাপ্পে-হালান্ডবন্দনা, নেইমার-রোনালদোর গুষ্টি উদ্ধার বা আয়োজক-ফিফার পক্ষপাত নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য।
২০২৬ বিশ্বকাপ দেখাকে কেন্দ্র করে এর মধ্যে বাংলাদেশে একাধিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ঢাকার আদাবরে একটি হত্যার ঘটনায় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার স্থলগুলোতে নজরদারি জোরদার ও নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ২৯ জুন আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ে ফুটবল খেলা দেখার পর স্থানীয় কিশোর-তরুণরা ঢোল বাজিয়ে হইচই করে। এ সময় আদাবর থানা বিএনপির সদস্য হাবিবুর রহমান নবোদয় বাজারের ব্যবসায়ী মজনুর ছেলে রিপনকে থাপ্পড় দেন। বিষয়টি নিয়ে রিপনের পরিবার ও হাবিবুর রহমানের পরিবারের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি মীমাংসার জন্য ১ জুলাই নবোদয় বাজারে সালিশ বসে। এ সময় হাবিবুর রহমান পক্ষের কয়েকজন নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপি সভাপতি মো. সাদ্দাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বাসার বাদশাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। বাদশাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ২ জুলাই পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। (ডেইলি স্টার অনলাইন ২ জুলাই)
ফুটবল কি আমাদের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে গেছে? নাকি পূর্ববিরোধ বা রাজনৈতিক শত্রুতাবশত এ হত্যা? যে কারণেই হোক, কোনো মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু কাম্য নয়।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে উদযাপনের বাড়াবাড়ি চোখে পড়ে হরহামেশাই। বিশেষ করে গভীর রাতে ঢোল, বাঁশি, ভুভুজেলা, উচ্চ স্বরে মাইক ও যানবাহনের হর্ন বাজানো; চায়ের দোকান, সেলুন ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কোলাহল সৃষ্টি ইত্যকার কাজের মাধ্যমে শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্ব, অসুস্থ ও পরীক্ষার্থীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে ফুটবল দর্শকরা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেলার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রায়ই তুমুল বাগ্বিতণ্ডা লেগে যায়। এসব বিবাদ মাঝেমধ্যে ভার্চুয়াল থেকে বাস্তবে আবির্ভূত হয়। পরাজিত দলের সমর্থকদের রাস্তাঘাটে হেনস্তার ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। সব মিলিয়ে ফুটবল যেন কারও প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়, সেটাই কাম্য। খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা শরীরচর্চা, নিয়মানুবর্তিতা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব ইত্যাদি গুণ অর্জন করতে পারি। অন্যদিকে উদযাপন যদি উন্মাদনায় রূপ নেয়, তাহলে তা ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অারেকটি বিষয়, বিশ্বকাপ বা মোটাদাগে খেলাধুলার বড় দর্শক হলেন শিক্ষার্থী ও তরুণরা। এ বছর এই মহাযজ্ঞ চলাকালে এইচএসসিসহ স্কুল-কলেজের নানা শ্রেণিতে দ্বিতীয় সাময়িক বা অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে পড়াশোনা-পরীক্ষার চাপ সামলানো, অন্যদিকে শখ বা বিনোদনের খেলায় মন পড়ে থাকা— এ দুটোর মাঝে ভারসাম্য রাখতে জটিলতায় পড়ে।
যাহোক, কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় বিবেচনায় রাখবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে জানমালের ক্ষতি বা মূল্যবান প্রাণের হানি ঠেকাতে প্রশাসন-সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট সবার সক্রিয় প্রচেষ্টাই আমাদের কাম্য।
লেখক: সাংবাদিক




