ল্যু সুন : এক পাগলের আখ্যান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘এক পাগলের আখ্যান’ ল্যু সুনের লেখা একটি ছোটগল্প। পাঠক বলতে পারেন ল্যু সুন আবার কে? তিনি বিংশ শতাব্দীর চৈনিক আত্মার দ্রষ্টা, মানবসভ্যতার বেদনার সন্তান, চীনের ভূমিপুত্র। জন্ম ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৮১, মৃত্যু ১৯ অক্টোবর ১৯৩৬। তিনি শতাব্দী থেকে শতাব্দীকে বহন করা বিপ্লবী, শুধু চীনা বিপ্লব নয়, জগতের বিপ্লবে তার বোধিসত্তা, হৃদয়-সম্বিৎ, মতাদর্শ মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। ল্যু সুন চীনের সামন্তীয় জীবনকে গভীর সংবেদনে বেদনার অক্ষরে বিম্বিত করেন। তিনি তার গল্পে ১৯১১ সালের বিপ্লবের আগে থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত চীনের বুদ্ধিজীবী, অসহায় শ্রমজীবী, অবলা নারী, দরিদ্র কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, জেলে, কাঠুরে, পাহাড়ি, ভবঘুরে, দাস, সামন্ত, গরিব পাড়া-প্রতিবেশীসহ জনগোষ্ঠীর জীবনাচারণকে জগতের সামনে উন্মোচন করেন। দর্পণে মুখ দেখে ভরে না মন, মন আরও কিছু দেখতে চায়। ল্যু সুন গল্পের বিম্বিত আয়নায়— অক্ষরের মধ্য দিয়ে সমাজের সত্যিকারের গল্পের বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। মানুষ গল্পের আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হয়ে পড়ে, মানুষ যে গল্পের বর্ণনার মানুষের মত, সে যে এমনই, নিষ্ঠুর, হিংস্র, বোবা, বোকা, ভালো বা মন্দ, সাহসী বা ভীতু। যে সত্য সে জেনেছে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। সেই তার প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্পে ঘটে যাওয়া এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ল্যু স্যুন এত গভীরভাবে সমাজচিত্র অঙ্কন বা বিম্বিত করেন, তা দেখে যে কেউ থমকে দাঁড়াবে। গল্প এত বাস্তব, এত চেনা।
‘এক পাগলের আখ্যান’ ল্যু সুনের এমন এক ছোট গল্প, জগতে যার জুড়ি মেলা ভার। এটি শতাব্দীর ওজনের চেয়ে ভারী, চীনা পাহাড়ের চেয়েও ঘন-গভীর, মধ্য এশিয়ার আকাশের চেয়ে বড়; জগৎ সভ্যতায় এমন গল্প খুব কম লেখকই উপহার দিতে পেরেছেন। যখন গল্পের নায়ক আখ্যান লেখা শুরু করলেন তখন তিনি রাষ্ট্র ও সমাজ বদলাতে চান, রীতিমতো তিনি এক রোমান্টিক বিপ্লবী। এই ঘুণেধরা সামন্তীয় সমাজ বদলানো তার জন্য আবশ্যকীয় বিপ্লব, এই কাজ ছাড়া তার জীবনে আর কোনো কাজ নেই। যেকোনো বদল বা বিপ্লবই অঘটন-ঘটনপটীয়সী কিন্তু বিপ্লব চীন, বাংলাদেশ বা রাশিয়ায় যেখানেই হোক পুরনো সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য, লড়াই ছাড়া তা কখনো সম্ভব হয় না। কিন্তু সে পথে বাধা অনেক। প্রথমে নিজের পরিবার, সমাজ তারপর রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হয়। সেটি করতে গিয়ে বাধে সংঘর্ষ। সেই লড়াইয়ে কেউ জিতে কেউ ধসে পড়ে।
আমাদের আলোচিত ছোটগল্প ‘এক পাগলের আখ্যান’, সেখানে বিপ্লবীকে পাগল হিসেবেই সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক প্রচল সমাজে যারা ব্যবস্থার বদল চায়, যারা প্রশ্ন করে, যারা নতুন সমাজব্যবস্থা চায়, শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, প্রত্যেক দেশে যার যার সময়ে তাকে পাগল বলে সম্বোধন করে। এ যেন সবসময়ের সব সমাজের আদল বা চেহারা। ল্যু সুন এ আদলকে শনাক্ত করেছেন, ব্যবস্থার ভয়াবহ রূপকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। ডায়েরি লেখকের মধ্য দিয়ে তিনি সতর্ক করছেন, জগতে বিপ্লব করতে গেলে কত সতর্ক হতে হয়, কত সিনসিয়ারলি জীবনকে দেখতে হয় ইত্যাদি।
বিপ্লব করতে গিয়ে ধরা পড়লে কী করে বাঁচতে হয়, ‘এক পাগলের আখ্যান’ গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি আমাদের সতর্ক করেন। বিপ্লব না করতে তিনি মানা করেন না, বিপ্লবকে এগিয়ে নিতেই তিনি সতর্ক করেন। ডায়েরি লেখক যে পাগল নন, একজন বিপ্লবী তা আমরা বুঝতে পারি। ল্যু সুন গল্পে কোনো চমক দিতে চাননি, তিনি শুধু সমাজের বাস্তব-চিত্রটা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। আখ্যান লেখকের যে ভাই সরকারি চাকরি করেন, তিনি সমাজের ভদ্রলোক। সে সমাজের সঙ্গে সরকারের প্রশাসনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, সরকারি চাকরিজীবী, আবার একজন নেতাও। সে নতুন সমাজ চায় না, যে সমাজে সে বড় হয়েছে সে সমাজের আইনকানুন, শোষণ-শাসন, নিপীড়ন-নিষ্ঠুরতা নিয়ে সে থাকবে। সে মনে করে এটাই তাদের পরিবারের জন্য ভালো। আখ্যান লেখক তার দৈনন্দিন ডায়েরির পাতায় লেখেন তার মা অসুস্থ, এ অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বড় ভাই— ‘মা’কে রান্না করে খেয়ে ফেলেছেন, এখন তার যে অবিবাহিত একটি বোন আছে তাকেও রান্না করে খাওয়ার পালা, তখন চীনা সমাজে সামন্তশ্রেণি— মানুষ খাওয়াকে নিজেদের সমাজব্যবস্থার অঙ্গ বলেই মনে করতেন। তাই ডায়েরি লেখক আশঙ্কা করতেন কখন তার ভাই তাকে ও তার বোনকে রান্না করে খেয়ে ফেলে কেউ বলতে পারে না। তখন ডায়েরি লেখক মনে মনে নতুন সমাজ চাওয়ার বদলে একটি সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা করেন। তখন তার বড় ভাই তাকে মুক্তি দেন। কিন্তু ডায়েরি লেখক পাঠকের জন্য শেষ কথা তখনো লেখেননি, লিখবেন; গোটা মানবজাতিকে তিনি সতর্ক করবেন।
ল্যু সুন তার গল্প সংকলনের ভূমিকার নাম দেন ‘হে যুদ্ধ স্বাগত’, তাতে তিনি লেখেন— ‘অনূদিত ইতিহাস থেকে আমি জানতে পারি পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ফলে ব্যাপকভাবে জাপানে সংস্কার শুরু হয়েছে। এ তুচ্ছ জ্ঞানই আমাকে জাপানের একটি প্রাদেশিক মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়। আমি স্বপ্ন দেখতাম চীনে ফিরে এসে বাবার মতো ভুল চিকিৎসার শিকার রোগীদের সারিয়ে তুলব। যুদ্ধ বাধলে সেনাবাহিনীর ডাক্তার হিসেবে কাজ করব এবং একই সময় সংস্কারেও দেশবাসীর আশা জাগিয়ে তুলব। জানি না মাইক্রোবায়োলজি ব্যবহারের জন্য আজ কী ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তখন জীবাণু দেখানোর জন্য লণ্ঠন স্লাইড ব্যবহার করতেন। তখন জাপান-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। কাজেই যুদ্ধের প্রচুর সিনেমা ছিল এবং অন্যান্য ছাত্রের সঙ্গে বক্তৃতা কক্ষে আনন্দ ও হাততালি দিতে আমাকেও যোগ দিত হতো। দীর্ঘদিন কোনো দেশবাসীকে আমি দেখিনি। কিন্তু একদিন একটা সিনেমায় বেশ কিছু চীনা দেখি, যাদের একজন বন্দি। তার পাশে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। তারা শক্ত-সামর্থ্য মানুষ কিন্তু উদাস। ধারা বর্ণনা অনুযায়ী বন্দি লোকটি রাশিয়ার গুপ্তচর। অন্যদের প্রতি হুঁশিয়ারি হিসেবে জাপানি সৈন্যরা যার মাথা কেটে ফেলবে। সেখানে সমবেত চীনারা এই মজা দেখতে এসেছে।
পড়া শেষ না করে আমি টোকিওর উদ্দেশে যাত্রা করি। কেননা এ সিনেমা দেখার পর চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া আর ডাক্তার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি দুর্বল এবং অনুন্নত দেশের লোক যত শক্ত-সামর্থ্যই হোক, উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে অথবা এ ধরনের ব্যর্থ পরীক্ষার সাক্ষী হতে পারে। এদের কতজন অসুস্থতায় মারা গেল তাতে কিছু যায়-আসে না। সেজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের মানসিক পরিবর্তন। সেই থেকে আমি উপলব্ধি করি এ ব্যাপারে সাহিত্যই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তমপন্থা, আমি একটি সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই।’
এমন বেদনাকে ধারণ করে ল্যু সুন লেখেন তার প্রথম গল্প ‘এক পাগলের আখ্যান’। গল্পের বাস্তবতা আপনাকে এতবেশি চমকে দেবে, যা আপনি কল্পনাও করেননি। তাই ল্যু সুনের গল্পকে নিছক গল্প বলা যাবে না। তার গল্প মানবজাতির জন্য এক বড় ব্যবস্থাপত্র। তিনি লেখেন— মানবসভ্যতার এই দীর্ঘ জার্নিতে এ পর্যন্ত মনে হয়, শিশুরা এখনো মানুষের মাংস খায়নি। শিশুদের বাঁচান! গল্প শেষে যেকোনো পাঠক লাফ দিয়ে উঠবেন। যদি পাঠক মানবজাতির লড়াই ও বিপ্লবের চেতন মানুষ হন, তাহলে বিষয়টি এত উত্তেজিত করবে আপনি অস্থির হয়ে উঠবেন। আজকে পুঁজিবাদী সভ্যতার বাটপার এনজিওগুলো সেভ দ্য চিলড্রেন, সেভ দ্য চিলড্রেন বলে যে চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন, তা কিন্তু ল্যু সুন থেকে ধার করা। পুঁজিবাদী সভ্যতা সেভ দ্য চিলড্রেনের নামে আরাকানে রোহিঙ্গা শিশু, গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুসহ পৃথিবী জুড়ে গণহত্যা করে যাচ্ছে। ল্যু সুনের জীবনের উৎকণ্ঠা আজও শেষ হয়নি। শিশুদের বাঁচাও। কেননা, শিশুরা আজও মানুষের মাংস খায়নি।



