পাখিবিষয়ক গল্প

আমাদের বাড়িঘরের দরজা-জানালাগুলো আমার অফিসফেরতা বাবার মতো। সন্ধ্যার আগে আগে ননীমোহন বসাক লেনের গলিতে যখন বাবার ক্লান্ত, অবসন্ন ছায়া এসে পড়ত, তখন সেই ছায়াকে আমার কাছে হিমালয়ের চেয়েও দীর্ঘ বলে মনে হতো।
বাবা কম কথা বলেন। অফিসে, ঘরে-বাইরে সবাই বাবার দোষ খুঁজে বেড়ান। এইতো সেদিন অফিসের বড় কর্তা সালাম সাহেব বললেন, রিয়াজ সাহেব, অন্যায় করল হামজা সাহেব আর তার দোষ গিয়ে পড়ল আপনার ঘাড়ে অথচ আপনি মুখ বুজে সব দায় নিয়ে নিলেন! বাবা বললেন, এই যে আপনি আসল ঘটনা জেনেছেন তাতেই হবে।
সালাম সাহেব অবাক হয়ে রিয়াজউদ্দিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবলেন, লোকটা এত বোকা কেন?
বাবা মানুষটা কেমন যেন।
২
বাবা কম কথা বলেন। প্রয়োজন না হলে কারও কথার কোনো উত্তরও করেন না। দোষ না করেও অন্যের দোষ মাথা পেতে নেন। পারলে অন্যের দোষের শাস্তিটাও তিনি মুখ বুজে বয়ে বেড়ান। কাছের, দূরের আত্মীয়স্বজন কত করে বাবাকে বোঝান, দোষ না করে তুমি কেন সবার সবকিছু মাথা পেতে নিতে যাও? প্রতিবাদ করো না কেন? কিছু বলো না কেন?
বাবা কিছু বলেন না। যখন সবকিছু সহ্য সীমার বাইরে চলে যায় তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলের সহায়-সম্বলহীন মানুষের মতো নেমে আসা গলায় নিজেকে নিজে বলেন, দেখবেন, একদিন সবকিছু ছেড়ে দুচোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যাব। আর পাবেন না আমাকে।
৩
বাবা যে বলতেন, একদিন সবকিছু ছেড়ে যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাবেন। আর পাবেন না আমাকে— সেগুলো কি ছিল শুধু কথার কথা!
আমার বাবা কোথাও চলে যাননি। চারদিকের এত অপমান, এত গ্লানি, এত অপবাদ, এত উপহাস— এসব ছেড়ে তিনি কোথাও চলে যেতে পারেন না।
অবসর নেওয়ার দুই বছর আগে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে বাবা শয্যাশায়ী হয়ে বিছানা নিলেন। টানা দশ বছর বেঁচেছিলেন। একা একা চলাফেরা করতে পারতেন না। ছেলেমেয়ের কাঁধে ভর করে এ ঘর থেকে সে ঘর করতেন। বারান্দায় গিয়ে একা একা মোড়ায় বসে থাকতেন। মা চা বানিয়ে দিলে মুড়ি দিয়ে খেতেন আর নিচের গলি দিয়ে মানুষজনের চলাচল দেখতেন।
শেষের দিনগুলোতে বাবা বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। কারও সাথে কথা বলতেন না। তিনি যে ঘরে থাকতেন তার দক্ষিণদিকে পাখির ডানার মতো ঝুলে থাকা জানালার ভাঙা পাল্লার ফাঁকফোঁকর দিয়ে বাচ্চাকাচ্চারা যেভাবে বিস্ময় নিয়ে আকাশ দেখে, তিনিও সেরকম করে আকাশ দেখতেন।
আচ্ছা, আকাশ দেখতে দেখতে তারও কি পাখি হওয়ার ইচ্ছে জাগত!
আজকাল সময়, অসময় আর নিঃসীম দুঃসময়ে বাবা আমার সাথে দেখা করেন। দেখা হলে তিনি নেমে আসা গলায় কথা বলেন। এইতো কয়েক দিন আগে অফিস শেষে প্রচণ্ড গরমে বাসে সিট না পেয়ে ভিড়ের মধ্যে মানুষজনের সাথে লেপটে দাঁড়িয়ে ঘামছি। হঠাৎ শুনলাম পাশ থেকে কেউ একজন নেমে আসা গলায় আমাকে বলছেন, সবার সাথে থাকবি পাখির মতন। কাউকে কিছু বলবি না। কোনো কিছুর সাথে নিজেকে জড়াবি না।
৪
আমিও এখন পাখি হওয়ার স্বপ্ন দেখি। মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে দেখি আমার ভাড়া বাড়ির পুরনো দরজা- জানালাগুলো অনেক রাতে পাখির মতন আকাশের দিকে উড়াল দিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।
আমার বাবা মানুষটা পাখি খুব পছন্দ করতেন।



