কবিতার শহীদ

কবির সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে লেখক
শহীদ কাদরী চলে গেছেন, কিন্তু স্মৃতির সুরভি ম্লান হয়নি আজও বিন্দুমাত্র। আমার নিজের জীবন নানা বৈচিত্র্যে ভরা। ঢাকা এবং নিউ ইয়র্কে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে জীবনে কত বাড়তি আনন্দ ও অভিজ্ঞতা যে যুক্ত হয়েছে! নিউ ইয়র্কে শহীদ কাদরী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং দুই পরিবারের মিলনে নীরা আপা ছিলেন অনুঘটক। কবিতা ভালোবাসি সেটা তো ছিলই, তবে তিরিশের কবিদের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং আগ্রহ দেখে শহীদ ভাইও বোধকরি আমাকে তার কাছের মানুষ ভাবতেন। নিউ ইয়র্ক থাকাকালে নিয়মিতই আড্ডা বসত আমাদের। শহীদ ভাই-নীরা আপা, হাসান ফেরদৌস-রানু ভাবি, মোমেন ভাই-ডেইজি ভাবি, তাজুল ইমাম-স্বপ্ন আপা কিংবা রকল্যান্ড কাউন্টিতে আমার বোন নীলুর বাসায়। হাসান ফেরদৌস ভাইয়ের বাসায় এক সন্ধ্যায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আনন্দবাজার পত্রিকার সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, লেখক পূরবী বসু, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তসহ আরও অনেকে। যতদূর মনে পড়ে, বুদ্ধদেব বসুর বড় কন্যা মীনাক্ষী দত্তও ছিলেন তার স্বামী সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্তসহ। শহীদ ভাইয়ের একটি নতুন কবিতার জন্য সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত খুব পীড়াপীড়ি করছিলেন সেদিন। শহীদ ভাই রাজি হচ্ছিলেন না, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত উঠে গিয়ে কবিতার জন্য অগ্রিম সম্মানী জোর করে শহীদ ভাইয়ের পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। শহীদ ভাই টাকাটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আরে, আমাকে দিয়ে হবে না। টাকা নিয়ে নাও।’ একদিন তিরিশোত্তর কবিতা নিয়ে কথা বলার সময় বললেন, ‘নিঃসঙ্গতার অর্থ এবং এর উপলব্ধি ওয়েস্টার্ন সাহিত্য থেকে শিখেছে বাঙালিরা। ওয়েস্টার্ন সাহিত্য থেকে এটাও শিখেছে— যা সুন্দর, শুধু তাই নয়, সবকিছুই কবিতার বিষয় হতে পারে। আমাদের আধুনিকপূর্ব কবিতা শুধু সৌন্দর্যকেই বিষয়বস্তু করেছে। সেখানে আধুনিক কবিতা সৌন্দর্যের সঙ্গে কদর্যতাকেও এনেছে। যে হাত হরিণের মতো প্রাণী তৈরি করেছে, সে বাঘের ভয়াবহতাকে তৈরি করল কীভাবে?’ সব অর্থে একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন শহীদ কাদরী। ১৯৪২ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসের দিলকুশা স্ট্রিটে শহীদ কাদরী জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পরে ১৯৫২ সালে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে বাংলাবাজারে ফুপুর বাসায় উঠেছিলেন। জীবনে প্রথম সদরঘাটে গিয়ে নৌকা দেখে কতটা ভালো লেগেছিল, বলেছিলেন সে কথাও। আড্ডায় অবধারিতভাবে চলে আসত নানা কবি-সাহিত্যিকদের প্রসঙ্গ। তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন আল মাহমুদ এবং শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমানের প্রসঙ্গ এলেই আমি একটু উসকে দিতাম। কিন্তু শহীদ ভাই সে ফাঁদে পা দিতেন না। তবে আড্ডায় প্রায় সময়ই বন্ধুদের অনেক দুর্বলতা বা কৌতূহল-উদ্দীপক কথা বলে হো হো করে হাসতেন। আল মাহমুদকে নিয়ে এ গল্পটি অনেকবারই শোনা। শহীদ কাদরী শুধু মেধাবী মানুষ ছিলেন না, তার দুষ্টুমিও ছিল উচ্চপর্যায়ের। এ গল্পটি বোধকরি অনেকেরই জানা, তবু বলছি শহীদ ভাইয়ের মুখে শোনার স্মৃতিটুকু অমূল্য বলে। একদিন আল মাহমুদ এসেছেন শহীদ ভাইয়ের বাসায়। এটা টের পেয়ে শহীদ ভাই বাথরুমে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে আল মাহমুদের কবিতা আওড়াতে লাগলেন একটার পর একটা। আল মাহমুদ বিমোহিত। শহীদ ভাই বাথরুম থেকে বের হয়ে এলে আল মাহমুদ মুগ্ধ বিস্ময়ে বললেন, শহীদ, আমার এতগুলো কবিতা মুখস্থ? পরে আল মাহমুদ আবিষ্কার করেন, শহীদ কাদরী আল মাহমুদের কবিতার বই বাথরুমে রেখে দিয়েছেন এবং সেখান থেকে দেখে দেখে পড়েছেন! এই হলো কবি শহীদ কাদরীর নির্দোষ(?) দুষ্টুমির চেহারা। শামসুর রাহমানই কবি শহীদ কাদরীকে বলেছিলেন, শহীদ, বই বের করার জন্য ব্যস্ত হবেন না। প্রথম বই বেছে বের করবেন। পরে যা-ই করেন। শহীদ ভাই যখন স্কুলে পড়েন, শামসুর রাহমান তখন ইউনিভার্সিটিতে। শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা ১৯৫৬ সালে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ছাপা হয়। সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের ‘পূর্বাশায়’। কবিতাটির নাম ছিল ‘গোধূলির গান’। আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এই কবিতাটি প্রকাশের ঠিকুজি ধরে সবাই আমাকে পঞ্চাশের কবিদের দলে ঠেলে দিচ্ছে।’ একটু কি অভিমান ছিল শহীদ কাদরীর কণ্ঠে। আরও বলেছিলেন, ‘এখনও কোনও বইয়ে কবিতাটি নিইনি। স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করছি, শোনো!’ ‘জানি না ক্লান্তির আর্তি ছাড়া অন্য কোনো ধ্বনি ছিলো কিনা সন্ধ্যার/ নদীর স্বরে।/ কে যেন মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করে কবেকার ভুলে যাওয়া নাম/ ছেলেটি কি বোঝে!’ আসলে চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই নাকি সব বোঝে এই ছেলেটি! নারী, প্রেম, নিঃসঙ্গতা। জিজ্ঞেস করি, কী বুঝতেন শহীদ ভাই সেই এত ছোট বয়সে? ঘর আলো করা উচ্চকণ্ঠে হেসে বললেন, সব বুঝতাম। জানো তো, ৭-৮ বছর বয়স থেকে সব ধরনের ছবি দেখতাম। এমন অন্তরঙ্গ মজার ঢঙে কথাগুলো বলছিলেন যে, দুজনই হো হো করে হাসতে থাকি। আমার সবসময় মনে হতো, কবিতা না হয় তেমন লিখছিলেন না কিন্তু আত্মজৈবনিক কোনো লেখা লিখলেন না কেন? শহীদ ভাই বলেছিলেন, নীরা বন্ধু হিসেবে সেটা আমি করতে পারি না। এই আমাদের শহীদ ভাই। বন্ধুবৎসল কবি শহীদ কাদরী। ৩৮ বছর বিদেশে কাটিয়েছেন। জার্মানি, লন্ডন, বোস্টন, নিউ ইয়র্ক। তবু দেশ তাকে বারবার ডেকেছে। সেই ডাক স্পষ্ট শুনতে পেতেন যেন। কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘আমার চুম্বনগুলি পৌঁছে দাও’। নিজে যখন এলেন আমরা তাকে দেখলাম। তিনি আর কিছুই দেখতে পেলেন না! জানতে পেলেন না চুম্বনগুলো ঠিকঠাক পৌঁছেছিল কি না।







