পর্তুগিজ বাংলার অভিনব আখ্যান

বইটি প্রকাশ করেছে সংবেদ
ভৌগোলিক ইতিহাসের মর্মকথা
‘সুবর্ণপুরাণ’ উপন্যাসের (২০২২) প্রধান আখ্যানস্থান বৃহত্তর বঙ্গদেশ হলেও, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে একই বৃত্তে বিচিত্র ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে আছে। দিল্লির আকবর-জাহাঙ্গীর থেকে বাংলার ঈশা খাঁর যুদ্ধ যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের মরক্কো ও মালাক্কার নাবিক-পর্যটকদের কথা। এসেছে পর্তুগালের বিশ্বপরিব্রাজক ক্রিস্টোফার কলম্বাস থেকে ভাস্কো দা গামার কথা। এসেছে ভারত উপমহাদেশের বলিষ্ঠ বিদেশি শাসক আলফানসো ডি আল বুকার্কের কথা। শুধু পর্তুগিজদের কথা নয়; প্রসঙ্গক্রমে ফরাসি, ওলন্দাজ, দিনেমার ও ইংরেজদের কথা এসেছে। পর্তুগিজ মহাকাব্য ‘উজ লুজিয়াদাস’ থেকে ওপোর্তুর জাদুঘরের কথা এসেছে। শুধু বিদেশি বণিক নয়, বাংলার বণিক হাফিজুদ্দিন, লাঠিয়াল সর্দার সিধু ক্ষ্যাপা ও জদ্দন বাঈসহ আছে ঝাঁকে ঝাঁকে জাহাজের মেলা— সুমাত্রা, সিংহল, বালি, জাভা, গোয়া, গুজরাট থেকে বোর্নিওর নোঙর ফেলা কত কত জাহাজ।
আর এসেছে ভাটি বাংলার স্বাধীন সোনারগাঁ কিংবা সুবর্ণগ্রামের মসলিন শিল্পের অনন্যতা। নদীমাতৃক বাংলার বিচিত্র নৌযানের কথা। গির্জা ও মসজিদের স্থাপত্যের এক ব্যতিক্রমী বাংলার মানুষের নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ও ইতিহাস ও ভূগোলের শিকড় সন্ধান। ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধিতা নয়, অনুকরণ নয়, পারভেজ হোসেন তার ‘সুবর্ণপুরাণ’-এ চারশ বছর আগের এক অনন্য বাংলার আখ্যানের চিত্রমালা গেঁথেছেন। সুরভিত পুষ্পমালায় প্রস্ফুটিত হয়েছে দুই বিদেশি পর্যটকের কথামালা। একজনের নাম ফ্রান্সিস রাফায়েল, অন্যজন আবু ইবনে আল আসাদ। একজন মালাক্কাবাসী পর্তুগিজ নাবিক পর্যটক, অন্যজন মরক্কোর পর্যটক।
নদী ও নারী: অভিনব পরম্পরা
ভাটি বাংলার স্বাধীন সোনারগাঁর চারদিকে চার নদীর বেষ্টন যেন এক অভিনব রাজধানী। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও ব্রহ্মপুত্র নদীর দেয়াল— অপূর্ব বঙ্গ প্রকৃতির এক অপরূপ ঐশ্বর্য। যুদ্ধ, লুণ্ঠন ও ধর্মান্তরসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নৌবাণিজ্যের বিস্তার— ‘সুবর্ণপুরাণ’-এর প্রধান আখ্যান বিন্যাস। কথাশিল্পী পারভেজ হোসেনের কলমে প্রকাশিত হয়েছে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনের কথা। ঐক্য আর সম্প্রীতির কথা যা আসে ভাব ও ভক্তির পথেই। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র ও ধলেশ্বরীঘেরা ভাটি বাংলার রাজধানী সুবর্ণগ্রামের ভৌগোলিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিশাখাপত্তনম থেকে গঙ্গার হুগলি নদীর তীরবর্তী ব্যান্ডেল বন্দর হয়ে পদ্মাবতী, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীপথের সৌন্দর্যসাধনা যেন নীরব স্বর্গ রচনা। নদী এবং নৌযানের গভীরে আরও হৃদয়-সম্পদ প্রতিফলিত হয়েছে— অপার্থিব ঐশ্বর্যের নাম— নারীকুসুম। সুফিয়া পর্তুগালে গিয়ে হয়ে যান, সোফিয়া। ‘সুবর্ণপুরাণের’ অন্যতম চরিত্র ‘আয়েশা’। বিভিন্ন নদীপথ ঘুরে, বিচিত্র মানুষের হাত ঘুরে, একসময় লক্ষ্ণৌর বাইজি জদ্দনের কাছে আশ্রয় পায় সে। আয়েশাকে কেন্দ্র করে ধর্ষণ, নির্যাতন ও অপহরণের এবং দাসী হিসেবে বিক্রি হওয়ার রোমহর্ষক চিত্র— কথাকারের দক্ষতায় হৃদয়হীন নির্মমতার বর্ণনা পাওয়া যায়।
‘সুবর্ণপুরাণ’ আখ্যানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্তুগিজ বণিক ফ্রান্সিস রাফায়েলের সঙ্গে বাইজি রওশন আরার সম্পর্ক। লক্ষ্ণৌর জদ্দন বাইয়ের কন্যা রওশনকে কেন্দ্র করে দুই ভিন্ন পুরুষের প্রণয় আলেখ্য এক ভিন্ন মাত্রা দেয়। একদিকে বণিক পর্যটক ফ্রান্সিস ও অন্যদিকে, সুবর্ণগ্রামের প্রধানমন্ত্রীর পুত্র আলাউদ্দিনের প্রণয়। রাজপুত্র বাগদাদী রাজপুরুষ হলেও তিনি ছিলেন কবি।
বিদেশি ও বঙ্গসংস্কৃতির মেলবন্ধন
কথাশিল্পী পারভেজ হোসেন শুধু বাংলার লোকায়ত জীবনের কথা লেখেননি, বাংলার অন্তরাত্মার গভীরতা সন্ধান করেছেন। আবু ইবনে আল আসাদের বয়ানে, প্রাচ্যের ভাব ও ভক্তির এক আশ্চর্য শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। নৌবাণিজ্যের থলিতে করে প্রাচ্য তথা বাংলার সম্পদ, ঐশ্বর্য ও অতীন্দ্রিয়বাদের কথা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে যেভাবে রূপকথার জন্ম দিয়েছে— নৌবাণিজ্য বিস্তার স্পেন ও পর্তুগালকে প্রভাবিত করেছে। সামুদ্রিক নৌবাণিজ্যের পথ ধরে পর্তুগিজরা ভারত তথা বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, ধর্ম ও জীবন সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে— আখ্যানে সেসব কথা বলেছেন।
শুধু নর-নারীর মনস্তত্ত্ব নয়, বঙ্গজীবনের সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমতা প্রতিফলিত হয়েছে বইটিতে। চিত্রিত হয়েছে ভাটি বাংলার মসলিন, বিশ্বসেরা মসলিনের রপ্তানির কথা। ২৪ পর্বের ‘সুবর্ণপুরাণ’ আখ্যানে বিচিত্র পেশার মানুষের বিচিত্র জায়গা চিত্রিত হয়েছে। কৃষ্ণনগর থেকে আসা শঙ্খশিল্পীদের মরমিকথা, সেই সঙ্গে বাংলার প্রথম কবি চন্দ্রাবতীর রামায়ণ থেকে মনসার গান, বেহুলা-লখীন্দরের পালা, অখণ্ড রূপসী বাংলার লোকায়ত ধ্রুপদি জীবনের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব বিদেশিদের আকর্ষণ করেছে। মুগ্ধ করেছে ইউরোপকে।
বিচিত্র শৈলীসন্ধান: ব্যতিক্রমী আখ্যান
চারশ বছর আগের ইতিহাসকে কথাকার পারভেজ হোসেন তার উপন্যাসের কৈফিয়ত অংশে লিখেছেন, ‘চারশ বছর আগে বাঙ্গালায় ভ্রমণে আসা উপনিবেশবিরোধী সেই তরুণ নাবিক ফ্রান্সিস রাফায়েলের হৃদয়ের আর্তি এই উপন্যাসের আকর।’
কিন্তু এখানে আখ্যানমালায় ত্রিমাত্রিক বয়ানে ‘সুবর্ণপুরাণ’ এক ব্যতিক্রমী আখ্যানে পরিণত হয়েছে। প্রথমত মরক্কোর পর্যটক আবু ইবনে আল আসাদ, দ্বিতীয়ত মালাক্কার পর্তুগিজ পর্যটক ফ্রান্সিস রাফায়েল এবং তৃতীয়ত লেখক নিজের মতো ভাষা ও আখ্যানমালার এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মেলবন্ধন রচনা করেছেন।
পারভেজ হোসেনের ‘সুবর্ণপুরাণ’ (২০২২) একটি গবেষণামূলক উপন্যাস, যা বাংলা আখ্যানের ইতিবৃত্তে বিশেষত একুশ শতকের বাংলা আখ্যানের নবদিশা।
কথাকার হোসেনের এ আখ্যানমালায়, মূল আখ্যানের সঙ্গে আরও অনেক ছোট আখ্যান সম্পৃক্ত হয়ে, চারশ বছরের বাংলা উপনিবেশ ও বঙ্গ সংস্কৃতির ঐশ্বর্য সন্ধান— এক সার্থক ইতিহাস ও ভূগোলের উপাদান সামনে এসেছে। সেই সঙ্গে ভাষাভঙ্গি, শৈলী সহজ-সরল-একরৈখিক মনে হলেও তা বহুমাত্রিক। যেন ইতিহাস ও ভূগোলের সঙ্গে জীবন্ত জীবনবিজ্ঞান।
‘সুবর্ণপুরাণ’: শেষ হয়েও হয় না শেষ
‘সুবর্ণপুরাণ’ উপন্যাস যেমন ত্রিমাত্রিক বয়ানে চিত্রিত, তেমনিই এতে ত্রিকালের সময় প্রস্ফুটিত হয়েছে। শুধু অতীত বা চারশ বছরের বাংলার ইতিকথা নয়। বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভাবনা আছে— এ অভিনব আখ্যানমালায়, পর্তুগিজ পর্যটক ফ্রান্সিস রাফায়েল ফিরে যাবে না— মালাক্কায় না, পর্তুগালেও না। তবে তিনি নিশ্চয়ই থেকে যাবেন অখণ্ড বাংলায়। সেই বাংলার কোথায় থাকবেন তিনি! কোথায় পর্তুগিজ ফ্রান্সিস রাফায়েলকে খুঁজে পাব? চট্টগ্রাম থেকে সপ্তগ্রাম! হুগলির ব্যান্ডেল (পর্তুগিজ শব্দ, বন্দর থেকে) থেকে পাদরি শিবপুর! কিংবা ঢাকা অঞ্চলের সেই বৃহত্তর আঠারো গ্রাম! সেই ইছামতীর সবুজ-স্বচ্ছ নদীর দুপাড়ে বান্দুরা থেকে হাসনাবাদ গির্জার কাছে কিংবা দোম আন্তোনিও রোজারিওর কর্মভূমির সেই নগরীতে, যেখানে বাংলা গদ্যের প্রথম বই লেখা হয়েছিল!
‘ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ (১৬৭০) কিংবা ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (১৭৩৫) পুস্তকগুলো পারভেজের পুরাণকে মনে করায়। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির দেশে, পর্তুগিজ ফ্রান্সিসকে থাকার ব্যবস্থা ও পরিবেশ রচনা করে, কথাকার— বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই বৃত্তে তিনটি কুসুমকে মিলিয়ে দিয়েছেন, যা মহৎ শিল্পের ধ্রুপদি মুনশিয়ানায় এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছে। পূর্ববঙ্গের ভূমিপুত্র পারভেজ হোসেন— একই সঙ্গে ত্রিকালকে সংযোজন করে, ভবিষ্যৎ স্রষ্টার পরিচয় দিয়েছেন। পর্তুগালের লিসবন থেকে বাংলাদেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম, ভারতবর্ষের মেদিনীপুর-গেঁওখালির পর্তুগিজ পদবির বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গবেষণাকে সঞ্চারিত করেছেন; যা এক ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বর্ণ ও বিচিত্র সংস্কৃতিকে, বাংলার আখ্যান ও শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে।






