পারিতে হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের দেখা

ছবি : লেখক
গুগলের মানচিত্রে হঠাৎ ভেসে উঠলো ‘র্যু তাগোর’ (Rue Tagore)। বসন্তের শেষভাগ। এই উষ্ণ, এই হিম। সেদিন সকাল থেকেই সূর্যটা তেতে ছিল খুব। চিটপিটে গরম না হলেও রোদের তাপ টের পাচ্ছিল ত্বক। ভাবলাম ভুল দেখলাম না তো? এখানে আসবেন কোত্থেকে ‘ঠাকুর’? এলাকাটি প্যারিসের ১৩তম আরোনডিসমো। চৈনিক ও জাপানিরাই এ তল্লাতে বসত গেড়েছেন বেশি। এখানকার দোকানপাট, হাটবাজার কিংবা রেস্তোরাঁগুলোও তাদের ঐতিহ্য জানান দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাবলাম, এ আবার তাদেরই কোনো মহারথির নামে পথ নয়তো?
প্রবোধ মানছেন না মন। যতই যাচ্ছি সড়কের নামটি ভেসে উঠছে মোবাইল ফোনে। মেট্রো স্টেশন খুঁজতে হাতে-পায়ে ধরেছি গুগলের। সে তো সবজান্তা শমসের! এও বলা হয় শুনি, ‘যা নেই ভূগোলে, তাই আছে গুগলে।’ নাহ, মনের মধ্যে কোথাও একটা উকো-খুশকো ভাব। ঠাকুরের নামে পথ, এ কোনো ঠাকুর তবে? অত বড় ঠাকুর দ্বিতীয়জন আছেনইবা কে? যার নামে ফ্রান্সের রাজধানী পারির পথের নাম হবে?
কবিগুরুর কলম তখনো মাথা গুঁজে আছে খেরোখাতাতেই। ধ্যানে ছেদ পড়ে ভেবে, বিড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলাম আমরা
হেঁটে হেঁটে কিছুটা ক্লান্ত বটে। উদ্দেশ্যহীন যাত্রা। ঘণ্টাখানেক হবে প্রায় পা দুটোর জিরান নেই। অবসরে প্রায়ই হেঁটে বেড়াই পারির চেনা-অচেনা পথ ধরে। সৌন্দর্য কিংবা প্রাসাদপম অট্টালিকার আভিজাত্য একঘেয়ে লাগে না কখনোই। শৈল্পিক শব্দটি কতটা অতলস্পর্শী, এ শহরে না এলে থেকে যেত অজানাই। অথবা পৃথিবীর অন্যতম পর্যটন নগরী যে এতটা সবুজ হতে পারে, পারি তা বিকল্পহীন দৃষ্টান্ত।
মাথায় তখনো রাজত্ব করছেন ঠাকুর। তার ওপর সূর্যের চোখ রাঙানি। পা দুটোও যেন গো ধরেছে। বলছে, ‘এবার একদণ্ড বিরাম দাও।’ মোবাইল ফোনের মানচিত্র বলছে, কাছেপিঠে সবুজ উদ্যান। র্যু তাগোরেই। ইতিউতি চোখ ফেলছি। হঠাৎ ভূত দেখার মতোই যেন চমকে উঠলাম। ‘আরে এ যে রবীন্দ্রনাথ!’ ইস্পাতের লম্বা লম্বা দণ্ডের ওপাশে গাছের ছায়ায় বসে লিখছেন কী যেন। তাকাতেই মনে হলো, ধ্যান ভাঙল। বললেন, ‘দাঁড়িয়ে কেন? একটু এগিয়ে গেলেই যে দুয়ার পাবে। এসো।’
উদ্যানের ছোট্ট দুয়ার পেরোব, অমনি চোখ গেল নামলিপিতে। ‘জারদা জ্যুঅঁ মিরো’। বিখ্যাত কাতালান-স্প্যানিশ চিত্রশিল্পীর নামাঙ্কিত উদ্যান। পৃথিবী যাকে ‘জোয়ান মিরো নামেই চেনে। আধুনিক শিল্প আন্দোলনে যার অসামান্য অবদান। বিশেষ করে বিংশ শতক জুড়ে পরাবাস্তববাদ, ফভিজমকে ফুটিয়ে তুলেছেন তার সব চিত্রকর্মে। প্রায় দুই হাজার চিত্রকর্ম, পাঁচশর বেশি ভাস্কর্য, চারশর মতো মৃৎশিল্প, পাঁচ হাজার অঙ্কন এবং হাজারের বেশি লিথোগ্রাফের নির্মাতা। এই মহান চিত্রশিল্পীর নামাঙ্কিত উদ্যানের এককোণে বসে, নির্জনে টিউলিপ ট্রির নরম ছায়ায় বসে আপন মনে লিখছেন বিশ্বসাহিত্যের আরেক নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পাথরের নিখুঁত আবক্ষ ভাস্কর্যের বেদিতে লেখা, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৬১-১৯৪১। অ্যাক্রিভাঁ, পোয়েত এ ফিলোজোপ। প্রি নোবেল দ্য লিতেরাচ্যুর-১৯১৩।’
ডানে সিঁথি কাটা কেশ পরিপাটি লেপ্টে আছে মাথায়। শ্মশ্রুমণ্ডিত সেই ঋষিতুল্য সুদর্শন পুরুষের হাতে ধরা পাথুরে কলম। কঠিন শীলার খেরোখাতায় নরম অক্ষরে কবি লিখছেন বিনীত নয়নে। এতটাই ধ্যানমগ্নতা জড়িয়ে আছে যে, বাম বাহুতে শিশুর মতো ঘুমিয়ে থাকা টিউলিপ ট্রির ফুলসমেত এগুচ্ছ পত্রপল্লবও নজরে আসছে না।
মননের স্বজনকে এ দূরদেশে খুঁজে পেয়ে প্রফুল্ল মন। জমে যাওয়া কত কথা আমাদের। লেখা থেকে চোখ না তুলেই যেন জবাব দিচ্ছেন তিনি। ‘স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা/ সন্ধ্যাতারাটি শিরীষডালের ফাঁকে।’
মোহাচ্ছন্নতায় কতটা সময় যে পেরিয়ে গেছে খেয়াল করিনি। কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ, বুঝতে পারিনি তাও। চকিতে চোখ ফেরাতেই দেখি ফরাসি এক প্রবীণ দম্পতি। দেখছেন মুগ্ধ নয়নে। যতটা না কবিকে, ততটা আমাকেই। বললেন, ‘চ্যু পারল আভেক কি?’ (কার সঙ্গে কথা বলছ তুমি?)
জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে। কিছু কথার পর বললাম, ফরাসিতে তার লেখা অনুবাদ হয়েছে অনেক। বইগুলো সহজলভ্যও। হেলেন জ্যু পাসকিয়ের করা গীতাঞ্জলির অনুবাদ L‘Offrande lyrique’। ইংরেজি থেকে এ অনুবাদের সুদীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে জিদ। শুনে বললেন, অবশ্যই সংগ্রহ করবেন। পড়বেন রবীন্দ্রনাথকে।
কথায় কথায় গড়িয়ে গেছে বেলা। উদ্যানে প্রাণের উপস্থিতি বলতে আমরা তিনজন। কবিগুরুর কলম তখনো মাথা গুঁজে আছে খেরোখাতাতেই। ধ্যানে ছেদ পড়ে ভেবে, বিড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। সবুজ উদ্যান থেকে। বাতাসে যেন দোল খাচ্ছে কোথাও, ‘সহজ ভাষায় কথাটা
বলাই শ্রেয়/যে-কেনো ছুতায় চলো এসো মোর ডাকে,/সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,/বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।’







