প্রদর্শনী পরিক্রমা
রেখার টানে মানুষের ইতিহাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিল্পের ভাষায় রেখা একই সঙ্গে সূচনা ও অনুসন্ধানের মাধ্যম। কখনো এটি দৃশ্যমান জগতের অবয়ব নির্মাণ করে, কখনো অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটায়, আবার কখনো হয়ে ওঠে চিন্তা, দর্শন ও সময়কে পাঠ করার স্বতন্ত্র ভাষা। রেখার এই বহুমাত্রিক সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান এক্সিবিশন হলে আয়োজিত Unbroken Line প্রদর্শনী বাংলাদেশের আধুনিক ও সমকালীন শিল্পচর্চার একটি বিস্তৃত পরিসর উন্মোচন করেছে। ৪২ শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে সাত দশকের শিল্পচর্চা মিলেছে রেখার পরিবর্তনশীল ভাষায়। ৯ অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত।
রেখাচিত্রকে প্রায়ই শিল্পশিক্ষার প্রাথমিক অনুশীলন কিংবা অন্য শিল্পমাধ্যমের প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ রেখা শুধু অবয়ব নির্মাণের উপকরণ নয়; এটি শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও প্রকাশভঙ্গিরও বাহক। রেখার গতি, ঘনত্ব, চাপ ও বিরতি নির্ধারণ করে দৃশ্যের আবেগগত ও ধারণাগত তাৎপর্য। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচে দ্রুত ও কৃশ রেখা ক্ষুধার্ত মানুষের শরীরকে নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি সামাজিক বিপর্যয়ের নৈতিক অভিঘাত তৈরি করে। অন্যদিকে কামরুল হাসানের লোকজ অবয়বভিত্তিক কাজে রেখা সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও জনজীবনের পরিচয় নির্মাণ করে। এই পার্থক্য দেখায়, রেখার অর্থ শুধু তার দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্যে নয়, বরং বাস্তবতাকে উপস্থাপনের শিল্পীর অবস্থানের মধ্যেও নিহিত।
প্রদর্শনীর
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন
প্রজন্মের শিল্পীদের কাজকে একই পরিসরে উপস্থাপন।
জয়নুল আবেদিনের পর্যবেক্ষণনির্ভর মানবদেহ, কামরুল হাসানের দৃঢ় ও অলংকারধর্মী
কনট্যুর, এস এম সুলতানের
পেশিবহুল কৃষক-শ্রমিকের অবয়ব
এবং সমকালীন শিল্পীদের ভাঙা, পুনরাবৃত্ত কিংবা প্রযুক্তিপ্রভাবিত রেখা পাশাপাশি দেখার
মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিল্পে
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অনুধাবন
করা যায়। এখানে ইতিহাস
শুধু শৈলীর কালানুক্রম নয়; বরং মানুষ,
সমাজ ও বাস্তবতাকে দেখার
বিভিন্ন পদ্ধতির সংলাপ।
জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-অঙ্কনে কাগজের শূন্যতা ও কালো কালির রেখা ন্যূনতম উপকরণে মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা প্রকাশ করে। বিপরীতে সুলতানের কৃষিজীবনভিত্তিক কাজে শরীরের পেশিবহুল গঠন শ্রম, শক্তি ও ভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে সামনে আনে। প্রথম ক্ষেত্রে মানবদেহ বঞ্চনার সাক্ষ্য, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা শ্রমজীবী মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতীক। একই উপাদান কীভাবে ভিন্ন সামাজিক অর্থ নির্মাণ করে, এই তুলনা তারই ইঙ্গিত দেয়। কামরুল হাসানের এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে পোস্টারে রেখার সংক্ষিপ্ততা ও তীক্ষ্ণতা আবার রাজনৈতিক প্রতিবাদকে সরাসরি জনমুখী ভাষায় রূপ দেয়। ফলে রেখার নন্দনতত্ত্ব তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যকারিতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না।
সমকালীন শিল্পচর্চায় রেখার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। ভাঙা, বিচ্ছিন্ন কিংবা পুনরাবৃত্ত রেখা কখনো স্মৃতির খণ্ডিত অভিজ্ঞতা, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা অথবা পরিবেশগত উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে। তবে এই পরিবর্তনকে পুরনো ও নতুনের সরল বিভাজন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। অতীতের শিল্পভাষা নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরে আসতে পারে, আবার সমকালীন নিরীক্ষাও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এই পারস্পরিক আদান-প্রদানই শিল্পের ধারাবাহিকতাকে অর্থবহ করে তোলে।
Unbroken Line শিরোনামটিও তাই তাৎপর্যপূর্ণ। অবিচ্ছিন্ন রেখা ধারাবাহিকতার প্রতীক হলেও তার গতিপথে বাঁক, পরিবর্তন ও বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, ব্যক্তিগত প্রকাশ ও সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বাধীন নিরীক্ষার সম্পর্কও এমন জটিল। তবে ধারাবাহিকতার ধারণাকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করলে শিল্প-ইতিহাসের বিচ্ছেদ, প্রান্তিক অভিজ্ঞতা ও অনুপস্থিত কণ্ঠ আড়ালে থেকে যেতে পারে। তাই প্রদর্শনীটির মূল্যায়নে শুধু বিভিন্ন প্রজন্মের উপস্থিতি নয়, কোন শিল্পভাষা প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে এবং কোন অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে প্রদর্শনীর বিন্যাস বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-অঙ্কনের পাশে সমকালীন কোনো শিল্পীর বিচ্ছিন্ন রেখার কাজ কিংবা কামরুল হাসানের রাজনৈতিক পোস্টারের পাশে লোকজ মোটিফনির্ভর শিল্পকর্ম স্থাপন করলে দর্শক ভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতার মধ্যে নতুন সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারেন। এতে শিল্পকর্মের পৃথক নান্দনিকতার পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যও উন্মোচিত হয়। তবে ৪২ জন শিল্পীর কাজের সমাবেশে পর্যাপ্ত দূরত্ব, আলোকসজ্জা ও ব্যাখ্যামূলক তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সম্মিলিত উপস্থাপনায় পৃথক শিল্পকর্মের স্বর হারিয়ে না যায়।
সব মিলিয়ে, Unbroken Line বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় রেখার ইতিহাস ও সমকালীন সম্ভাবনাকে নতুনভাবে পাঠ করার একটি পরিসর তৈরি করেছে। এর গুরুত্ব কেবল সাত দশকের শিল্পকর্মকে একত্র করার মধ্যে নয়; বরং রেখার মাধ্যমে ইতিহাস, রাজনৈতিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কীভাবে নির্মিত হয়, তা অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরিতেও নিহিত। রেখা এখানে দৃশ্যের অনুবাদমাত্র নয়, বাস্তবতাকে বোঝা ও প্রশ্ন করার মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলায়, অর্থ বদলায়; কিন্তু শিল্পের ভাষায় নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। সেই অর্থে Unbroken Line বাংলাদেশের শিল্পে ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের মধ্যকার চলমান সংলাপের প্রতীক।



