রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের বর্ষা

সংগৃহীত ছবি
রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের বর্ষা ঋতু নিবিড়ভাবে প্রভাবিত করেছে। কারণ, পৈতৃক জমিদারি দেখাশোনা করার জন্য তাকে বাংলাদেশের শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসর বারবার যাতায়াত করতে হয়েছে। ঘন ঘন এতবার আসা-যাওয়ার ফলে গ্রামবাংলার বর্ষা, বর্ষণ ও নদনদীর সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ঘটেছে। ফলে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশ তার মনের মধ্যে স্থায়ী একটি আসন গড়ে তুলেছে। বৃষ্টির ধ্বনি তাকে এতই আকৃষ্ট করত যে, ছেলেবেলায় তিনি ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান’ ছড়াটি লিখেছিলেন।
২
রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টিঝরা রাতদিনের মায়াবী প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের বর্ষা ঋতুর গানে। শ্রাবণের বর্ষা যে রবীন্দ্রনাথের গানের একটি উৎস, তার প্রমাণ মেলে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ নামের জনপ্রিয় গানে। পদ্মা-শিলাইদহের প্রকৃতি ও পরিবেশ রবীন্দ্রনাথকে এতটা মজিয়ে রেখেছিল যে, তিনি ভিন্ন ধরনের কবিতা বা গানেও নৌকাভরা সোনালি পাকা ধান, ছুটে চলা জলস্রোতের কথা লিখেছেন।
৩
‘বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ়’ গানটি যেন সে কথা মনে করিয়ে দেয়। কবিগুরু ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় লিখেছেন— ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরষায়/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়/সে কথা শুনিবে না কেহ আর/নিভৃত নির্জন চারি ধার/দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি/আকাশে জল ঝরে অনিবার/জগতে কেহ যেন নাহি আর।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সোনার তরী কবিতায়ও তিনি এঁকেছেন বর্ষার চিত্র। সেখানে লিখেছেন—‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা/কুলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা/রাশি রাশি ভারা ভারা/ধান কাটা হলো সারা/ভরা নদী ক্ষরধারা/খরপরশা/কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা।’
কবি বর্ষায় কখনো খুঁজেছেন গভীরতা, কখনো রোমান্টিকতা। কোথাও বা বর্ষার প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। যেমন তার আষাঢ় কবিতায়— ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর/নাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের/বাহিরে/বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর/আউশের ক্ষেত জলে ভরভর/কালি মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ চাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’
৪
কবিগুরু এমন প্রতীক্ষায় থেকে বলছেন, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে/আঁধার করে আসে/আমায় কেন বসিয়ে রাখ/একা দ্বারের পাশে/কাজের দিনে নানা কাজে/থাকি নানা লোকের মাঝে/আজ যে আমি বসে আছি/তোমারই আশ্বাসে।’ দিন পেরিয়ে গেলেও, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বর্ষার সে রূপ এখনো তেমনি আছে। সেই কালো মেঘে ঢেকে থাকা, অঝোর ধারায় বৃষ্টি এসব কিছুই বর্ষার বৈশিষ্ট্য। এমনই এক মেঘের দিনের বর্ণনা পাওয়া যায় কবির ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায়।
৫
মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।’ প্রতি বর্ষায় তিনি রচনা করেছেন নতুন নতুন গান, যেসব আজও স্পন্দন জাগায় আমাদের মনে। বৃষ্টির ফোঁটা ঝরলেই আমরা গাইতে থাকি— ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদলদিনে/জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন মন লাগে না...’ কিংবা— ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়/এমন মেঘস্বর বাদল-ঝরঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়...’ ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল’ হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন কবি। এমনই হৃদয়ছোঁয়া শত শত বর্ষার গান লিখেছেন তিনি। গীতবিতানে প্রকৃতি পর্যায়ের গানের সংখ্যা ২৮৩। এর মধ্যে বর্ষা পর্যায়ের গানের সংখ্যাই ১২০টির মতো। ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— ‘স্নিগ্ধসজল মেঘকজ্জল দিবসে/বিবশ প্রহর অচল অলস’।
৬
‘আবেশে/শশী তারা হীনা অন্ধতামসী যামিনী/কোথা তোরা পুরকামিনী/আজিকে দুয়ার রুদ্ধ ভবনে ভবনে/জনহীন পথ কাঁদিছে ক্ষুব্ধ পবনে/চমকে দীপ্তদামিনী/শূন্য শয়নে কোথা জাগ পুরকামিনী।’ কবিতাটিতে কবি কত সুন্দর করে একটি বর্ষা দিন চিত্রায়ণ করেছেন। আবার বর্ষার দিনে সব কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়ে। সে কথা বলেছেন, ‘অপেক্ষা’ কবিতায়— ‘মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে মিলায়ে থাক মাঠে/পড়িয়া থাকে তরুর শিরে/কাঁপিতে থাকে নদীর নীরে/দাঁড়ায়ে থাকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে।’
৭
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে বর্ষার বাস্তবতা অধিকতরভাবে ধরা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘সমাপ্তি’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘একরাত্রি’, ‘মহামায়া’, ‘শাস্তি’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’, ‘মণিহারা’ এবং বেশি করে বলতে হয় ‘অতিথি’ গল্পটির কথা। এগুলোর মধ্যে পদ্মা, অবিরাম বৃষ্টি, ঝড়জলের একটা না একটা প্রসঙ্গ আছেই। তবে ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পটি শ্রাবণ মাসে লেখা। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ বর্ষায় নিস্পন্দ বাংলাদেশের থমকে দাঁড়ানো রূপটি এঁকেছেন এভাবে— ‘বন্যার সময়ে গোরুগুলি যেমন জলবেষ্টিত মলিন পঙ্কি সংকীর্ণ গোষ্ঠ প্রাঙ্গণে মধ্যে ভিড় করিয়া করুণ নেত্রে সহিষ্ণুভাবে দাঁড়াইয়া শ্রাবণের ধারা বর্ষণে ভিজিতে থাকে, বাংলাদেশ আপনার কর্দমপিচ্ছিল ঘনসিক্ত রুদ্ধ জঙ্গলের মধ্যে মূকবিষণ্ণমুখ সেইরূপ পীড়িতভাবে অবিশ্রাম ভিজিতে লাগল।’
৮
‘আবার ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পে— ‘ছোটো একটা নদীর ধারে হাট। বর্ষাকালে নদী পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। কতক নৌকায় এবং কতক ডাঙায় কেনাবেচা চলিতেছে, কলরবের অন্ত নাই। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে এই আষাঢ় মাসে কাঁঠালের আমদানিই সবচেয়ে বেশি, ইলিশ মাছও যথেষ্ট। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে; অনেক বিক্রেতা বৃষ্টির আশঙ্কায় বাঁশ পুঁতিয়া তাহার ওপর একটা কাপড় খাটাইয়া দিয়াছে।’
সুতরাং বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন গান, কবিতা, ছড়া, গল্প এমনকি জীবনস্মৃতিও। তার বর্ষাবন্দনা এতই সমৃদ্ধ যে, বাংলা সাহিত্যে এমন বর্ষাবন্দনা মেলা ভার। তাই রবীন্দ্রনাথ হতে পেরেছেন, বাংলাদেশের বর্ষার রবীন্দ্রনাথ।




