স্মরণে শার্ল বোদলেয়ার
মেঘের মানচিত্র কিংবা বনান্তরের দিন এনেছেন যিনি

শার্ল বোদলেয়ার
ফরাসি কবি, সমালোচক ও অনুবাদক শার্ল পিয়ের বোদলেয়ারের জন্ম ১৮২১ সালের ৯ এপ্রিল, প্যারিসেই। ফরাসি সাহিত্যাঙ্গনেতো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেই তিনি এক উজ্জ্বল নাম; গদ্য-কবিতায় স্বতন্ত্রধারার সূচনাকারী এই কবি পরবর্তী সময়ের অগণিত কবিকে প্রভাবিত করেছেন, তাই তাঁকে বলা হয় 'আধুনিক কবিতার জনক'। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’—পাপের ফুল—আজও বিশ্বসাহিত্যে আদৃত, আলোচিত ও পঠিত।
তাঁর পিতা জোসেফ-ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ার ষাট বছর বয়সে দ্বিতীয়বার সংসার পাতেন নিজের চেয়ে চৌত্রিশ বছরের ছোট অনাথ তরুণী ক্যারোলিন দ্যুফের সঙ্গে; তখন ক্যারোলিনের বয়স মাত্র ২৬। এই অসম বয়সী দম্পতির ঘরেই জন্ম নেন ভবিষ্যতের জগদ্বিখ্যাত কবি। পিতা ছিলেন আত্মভোলা, সৎ, শিল্পীমনের অধিকারী এবং পেশায় শিক্ষক। তিনিই শিশু বোদলেয়ারের মধ্যে ছবি দেখা, চেনা ও শিল্পানুরাগের বীজ বপন করেন। কিন্তু ১৮২৭ সালে, বালক বোদলেয়ারের বয়স যখন মাত্র ছয়, তখনই পিতার মৃত্যু হয়। ঠিক এই সময়েই ফ্রান্সে রোমান্টিকতা আন্দোলনের চরম উত্থান। ১৮২৯ সালে বোদলেয়ারের বিধবা মা ক্যারোলিন পুনর্বিবাহ করেন ক্যাপ্টেন ওপিককে, যিনি পরে জেনারেল হয়েছিলেন। মাতা ও বিপিতার সমূহ ভালোবাসা পাওয়া সত্ত্বেও কিশোর বোদলেয়ার বিষ বিষ বিষন্নতায় ডুবে যান এবং জীবনভর সেই বিষাদই তাঁর কবিতার প্রধান সুর হয়ে রয়ে যায়।
১৮৩৬ সালে কর্নেল ওপিক প্যারিসে বদলি হয়ে এলে বোদলেয়ারকে একটি নামকরা হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। ছেলেকে নিয়ে (বি)পিতার উচ্চাশা ছিল; অধ্যক্ষের কাছে তিনি বলেছিলেন, “মসিয়ে, আমি আপনার জন্য একটি মূল্যবান উপহার এনেছি।” কিন্তু নিয়মবিরুদ্ধ মেধাবী বোদলেয়ার শিক্ষকদের বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যান, ইতিহাসকে “অর্থহীন বিষয়” বলে আখ্যা দেয়ায় ১৮৩৯ সালে স্কুল থেকে বিতাড়িত হন। এরপর তিনি লাতিন কোয়ার্টারে উচ্ছৃঙ্খল জীবনে ডুবে যান, নানা নেশায় আসক্ত হন এবং লুশেৎ নাম্নী এক রক্ষিতা রাখেন। ধারণা করা হয়, এই সময়েই তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হন, যে রোগই পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
১৮৪১ সালে মা ও বিপিতা ছেলের ভবিষ্যতের আশায় তাঁকে ভারত ভ্রমণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্যারিস ছাড়তে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত ১৮৪১ সালের ৯ জুন বর্ডো থেকে ‘সাউথ স্কাই’ জাহাজে করে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন বোদলেয়ার। কিন্তু জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপে ভয়াবহ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিন সপ্তাহ মরিশাসে আটকে থাকে। বোদলেয়ার প্যারিসে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং রেনোয়ার দ্বীপ থেকে অন্য জাহাজে করে ফিরে আসেন। এই একটিবারই তাঁর জীবনে বিদেশভ্রমণ; তবু এই প্রায়-প্রাচ্য-অভিজ্ঞতা তাঁর কাব্যে গভীর প্রভাব ফেলে। মৃত্যুর কিছুকাল আগেও তিনি ভারতবর্ষ নিয়ে কবিতা লেখার আশা প্রকাশ করেছিলেন।
১৮৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে ফিরে তিনি আইনত সাবালক হয়ে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। কে পায় আর শার্ল বোদলেয়ারকে? শুরু হয় বিলাসবহুল জীবন— উঁচুদরের হোটেল ‘পিমদাঁ’, দামি গালিচা, প্রাচীন গ্রন্থের সোনা-বাঁধানো সংস্করণ, চিত্রকর্ম সংগ্রহ, নারী সংসর্গ। কিন্তু এই অমিতব্যয়িতার ফলে ঋণের বোঝা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে টানতে হয়। ১৮৪২-৪৪ সময়েই তাঁর পরিচয় হয় জিন দ্যুভালের সঙ্গে, যে নারী কোনো-না-কোনোভাবে জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’-এর অধিকাংশ কবিতা এই সময়েই রচিত বলে ধারণা করা হয়।
পুত্রের উচ্ছৃঙ্খল জীবন দেখে শঙ্কিত মাদাম ওপিক ১৮৪৪ সালে প্রৌঢ় আইনজীবী আঁসেলকে ছেলের আর্থিক অভিভাবক নিযুক্ত করেন। ফলে বোদলেয়ার প্রতিমাসে শুধু মূলধনের সুদটুকুই পেতেন; মূলধনে হাত দিতে পারতেন না। এরপর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত। মায়ের এই সিদ্ধান্তের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মায়ের প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিলেন। অথচ পিতামাতার যথেষ্ট সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।
১৮৪৫ সালে হোটেল পিমদাঁ ছেড়ে সাধারণ পাড়ার বাড়িতে ওঠেন এবং শিল্প সাহিত্যকে জীবনে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর সমালোচনা ও কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম নভেলা ‘লা ফাঁফার্লো’। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব শুরু হলে বোদলেয়ার নিজেকে সেই প্রথমবারের মতো রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলেন, মেতে ওঠেন বিপ্লবের নেশায়।
এডগার অ্যালান পো-র রচনা বোদলেয়ারের জীবনে অপরিসীম প্রভাব ফেলে। সাহিত্যিক হতাশার মধ্যেই পো-র অনুবাদ তাঁকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। ১৮৫৬ থেকে ’৬৫ পর্যন্ত মোট পাঁচ খণ্ডে তিনি পো-র গল্প ও প্রবন্ধের অনুবাদ প্রকাশ করেন, যা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে বিবেচিত হয়। বোদলেয়ার নিজেকে পো-র অনুবাদক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। পো-এর মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, কাব্যের লক্ষ্য নীতিশিক্ষা নয়; কাব্য নিজেই নিজের উদ্দেশ্য। এছাড়া দুই দার্শনিক—জোসেফ দ্য মেস্তর ও সোয়েডেনবর্গ—তাঁর চিন্তাজগতে গভীর ছাপ ফেলেন। দ্য মেস্তর সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, “জোসেফ মেস্তর ও পো আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন।” বালজাকের মিস্টিক উপন্যাসের প্রভাবে তিনি ‘প্রতিসাম্য’ (আসল ফরাসি শিরোনাম হলো Correspondence's) ও ‘পুনর্জন্ম’ শীর্ষক (La Résurrection) কবিতা লেখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বোদলেয়ারের প্রেম ছিল বিচিত্র ও বিষাদময়। বহু বছরের প্রেমিকা জিন দ্যুভালের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে তিনি ম্যারি দোব্র্যাঁকে প্রেম নিবেদন করেন, কিন্তু ম্যারি ভালোবাসতেন বাঁভিলকে। প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি আশ্রয় নেন মাদাম সাবাতিয়ের পদতলে—প্যারিসের বিখ্যাত রূপসী, বহু শিল্পীর মডেল—যাঁকে তিনি নাম দেন ‘শ্বেত ভেনাস’। প্রতি রোববার সাবাতিয়ের গৃহে জমজমাট সাহিত্য আসরে যোগ দিতেন বোদলেয়ার; দু-বছর ধরে বেনামিতে তাঁকে পাঠাতেন গুচ্ছ গুচ্ছ প্রেমের কবিতা। ১৮৫৪ সালের ৮ মে শেষ অর্ঘ্য হিসেবে পাঠান ‘স্তোত্র’ কবিতাটি—এমন শান্ত, নম্র, হৃদয়ভজানো মিষ্টি কবিতা বোদলেয়ারের খুব কমই আছে।
স্তোত্র
(লে ফ্ল্যর দ্যু মাল)
প্রিয়তমা, সুন্দরীতমারে,
সে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার –
অমৃতের দিব্য প্রতিমা সে,
অমৃতেরে করি নমস্কার।
বাতাসে সত্ত্বার লবণ সে
বাঁচায় সে জীবন আমার,
তৃপ্তিহীন আত্মার গভীরে
সুধা ঢালে বারবার, বারবার।
(ইংরেজি থেকে অনুবাদ/ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
১৮৫৫ সালে সম্পাদক Auguste Poulet-Malassis বোদলেয়ারের আঠারোটি কবিতা একসঙ্গে প্রকাশ করেন; ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’ নামটি প্রথম এই কবিতাগুচ্ছের জন্যই ব্যবহৃত হয়। ১৮৫৭ সালের ২৫ জুন মোট একশো কবিতা নিয়ে বই আকারে প্রকাশিত হয় ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় তেফোয়েল গোতিয়েকে—“ফরাসি সাহিত্যের পরম জাদুকর, আমার অতি প্রিয়, অতি শ্রদ্ধেয় গুরু ও বন্ধু”—এই দূষিত পুষ্পগুচ্ছ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে প্রকাশের পরপরই ব্লাসফেমি ও অশ্লীলতার অভিযোগে কবিকে আদালতে উঠতে হয়; তিনশো ফ্রাঁ জরিমানা এবং ছয়টি কবিতা একশো বছরের জন্য নির্বাসিত হয়। এই নিষেধাজ্ঞাকে বোদলেয়ার মেনে নিয়েছিলেন নিজের আধুনিকতার শাপ বলে।
১৮৫৭ সালেই তিনি গদ্যকবিতা ‘Paris Spleen’ লেখা শুরু করেন—এক অর্থে দুনিয়ার সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন কাব্যগ্রন্থ। সমাজের গদ্যময় প্রাসাদ থেকে ফুটপাত, বৈভব থেকে বৈধব্য, প্রেম-অপ্রেম—সবকিছু কীভাবে কাব্যময় হয়ে উঠতে পারে, তার অপরূপ নিদর্শন রেখে গেছেন তিনি। ১৮৬১ সালে নতুন পঁয়ত্রিশটি কবিতা যোগে ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। এই সময় জার্মান গীতিকবি ভাগনারের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব হয়; এমনকি শেষ রোগশয্যায় বোধবুদ্ধি লুপ্তপ্রায় অবস্থাতেও বোদলেয়ার ভাগনারের সংগীতে সাড়া দিতেন।
১৮৬২ সালে চিত্রশিল্পী এদুয়ার মঁনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় বোদলেয়ারের; মঁনের আঁকা ‘লোলা দ্যু ভাসেঁল’ দেখে মুগ্ধ হয়ে বোদলেয়ার একটি সনেট লেখেন, আর মঁনে এঁকে যান বোদলেয়ার ও জিন দ্যুভালের প্রতিকৃতি। ১৮৬৩ সালে ফিগারো পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Modern Life Artist’।
কিন্তু আর্থিক অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে ওঠে। প্রকাশক পুলে মালাসি দেনার দায়ে কারারুদ্ধ হলে বোদলেয়ার নিজেও পাঁচ হাজার ফ্রাঁ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৮৬৪ সালে প্রকাশকের সঙ্গে তিনিও বেলজিয়ামে পাড়ি জমান বক্তৃতা দিতে, কিন্তু শ্রোতার অভাবে তেমন আয় হয়নি। ১৮৬৫ সালের জুলাইয়ে হঠাৎ আলুথালু বেশে প্যারিসে ফিরে তরুণ কবি কাত্যুল মাঁদেসের কাছে হিসাব করে দেখান, পঁচিশ বছরের সাহিত্যজীবনে তাঁর মোট আয় মাত্র পনেরো হাজার আটশো বিরানব্বই ফ্রাঁ ষাট সঁতিম। রাতে মাঁদেস তাঁর কান্নার শব্দ শুনতে পান; ভোরে চিরকুটে ‘বিদায়’ লিখে বোদলেয়ার আবার হারিয়ে যান ব্রাসেলসে।
১৮৬৬ সালে ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত হয় ল্যা ফানফারলো বা ‘বেওয়ারিশ মাল’, যাতে নতুন কবিতার সঙ্গে পুরনো নিষিদ্ধ ছয়টি কবিতাও যোগ হয়। কিন্তু ক্রমেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে তাঁর। পক্ষাঘাত, বাকশক্তি লোপ, এমনকি নিজের নামও ভুলে যান। ১৮৬৬ সালের ২ জুলাই বন্ধুদের চাঁদায় ট্রেনের কামরা রিজার্ভ করে তাঁকে প্যারিসে ফিরিয়ে আনা হয়; একটি নার্সিংহোমে স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ১৮৬৭ সালের মে মাসে অবস্থার চরম অবনতি হয়—আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে অপরিচিত ভেবে অভিবাদন জানাতেন, নিজেকে কখনো ভাবতেন নের্ভাল। জুনের প্রথম সপ্তাহে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন; এরপর দু-মাস কাটে জ্ঞানহীন মুমূর্ষু অবস্থায়। ১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট বেলা এগারোটায় মাত্র ছেচল্লিশ বছর চার মাস বয়সে মায়ের কোলে মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মৃত্যুর পরেও খুব বেশি সম্মান পাননি। সৎকারের সময় একশো লোকও সমবেত হয়নি, বক্তৃতা দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি, এমনকি প্যারিসের জাদরেল সাহিত্য পরিষদ পর্যন্ত কোন প্রতিনিধি পাঠায়নি। ১৮৬৭ সালের নভেম্বরে তাঁর গ্রন্থগুলো নিলামে ওঠে; প্রকাশক মিশেল লেভি পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের জন্য মাত্র এক হাজার সাতশো পঞ্চাশ ফ্রাঁয় সমগ্র রচনাবলির স্বত্ব কিনে নেন।
তবু সময়ের মতো বড় একজন বিচারক তো বসে থাকে পৃথিবীতে, সময় প্রমাণ করেছে বোদলেয়ারের রচনার মহত্ত্ব। আধুনিক নাগরিক জীবনের জটিলতাই ছিল তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়; যা কিছু কবিতা নয়, তা থেকে কবিতাকে মুক্তি দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। তিনি ক্ল্যাসিক ও রোমান্টিকের চিরাচরিত দ্বৈতাদ্বৈতবাদী চিন্তা লুপ্ত করে দিয়েছিলেন; আবেগের নিবিড়তম মুহূর্তেও উচ্ছ্বাসের কাছে ধরা দেননি। কবির ওপর সবসময় কবিতাকে স্থাপন করেছিলেন; সমালোচকেরা বলেন, তাঁর কবিতায় কোনো হেঁয়ালি নেই—প্রতিটি কবিতা স্বপ্রতিষ্ঠ, স্বতোদ্ভাসিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, “সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানেন। কবিরাই ঈশ্বর।”
তিনি লিখেছেন, আধুনিক কবি হলেন অপরসায়নবিদ—যিনি কাদা থেকে সোনা বানান, পঙ্ক থেকে ফোটান পদ্ম, জীবনের পঙ্কিলতার মধ্যেও খুঁড়ে তুলে আনেন সৌন্দর্য। এই দর্শনই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে চিরস্থায়ী এক আসনের মালিক করেছে। ফ্রান্সে তাঁর সমাধিস্থলে আজও ছুটে আসেন অজস্র কবি, কাব্যপ্রেমিক ও ভ্রমণপিপাসু।
আসুন পড়ি, আমাদের কবি বুদ্ধদেব বসু অনূদিত শার্ল বোদলেয়ারের কয়েকটি অসামান্য কবিতা
আশ্চর্য মেঘদল
বলো আমাকে, রহস্যময় মানুষ,
কাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো:
তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?
পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী–কিছুই নেই আমার।
তোমার বন্ধুরা?
ঐ শব্দের অর্থ আমি কখনও জানিনি।
তোমার দেশ?
জানিনা কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।
সৌন্দর্য?
পারতাম বটে তাকে ভালোবাসতে- দেবী তিনি, অমরা।
কাঞ্চন?
ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।
বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ,
কি ভালোবাস তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ... চলিঞ্চু মেঘ... ঐ উঁচুতে... ঐ উঁচুতে...
আমি ভালবাসি আশ্চর্য মেঘদল!
প্যাঁচারা
জ্ঞানীর চোখ, তা দেখে যায় খুলে
হাতের কাছে যা আছে নেয় তুলে
থামায় গতি, অবুঝ আন্দোলন;
শান্তি তার এ তো চিরন্তন-
কেবল চায় বদল, বাসা বদল!
পণ্য কবিতা
(লে ফ্ল্যর দ্যু মাল)
কবিতা, মানসী, তুই, প্রাসাদের উপাসক জানি কিন্তু বল,
যখন প্রদোষকালে, হিমেল বাতাসে নির্বেদে,
নীহারপুঞ্জে জানুয়ারি কালো হয়ে আসে –
নীলাভ নয়নে তোর তাপ দিবি, আছে তো জ্বালানি?
মর্মরে নিটোল তনু; কিন্তু তার পুনরুজ্জীবন
হবে কি বাতায়নের রন্ধ্রে বেঁধা দীপের শিখায়?
যেমন রসনা নিঃস্ব, সেইমতো শূন্য পেটিকায়
ভরাবি, আকাশ ছেঁকে, নীলিমার উদার কাঞ্চন?
না, তোকে যেতেই হবে, দিনশেষে অন্ন জোটে যাতে,
মন্দিরে, দাসীর মতো, আরতির কাঁসর বাজাতে,
যে-মন্ত্রে বিশ্বাস নেই, মুখে তাই জপ করে যাবি,
কিংবা, উপবাসী তুই, পরে বিদূষকের বসন,
না-দেখা চোখের জলে ভিজিয়ে রঙিন প্রহসন,
ইতর জনগণের তিক্ততায় আমোদ জাগাবি?
লেখক: হেড অব ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ এন্ড ইভেন্টস এবং সাহিত্য সম্পাদক, আগামীর সময়















