লংলিয়া ছড়া খাসিয়াপুঞ্জিতে

শ্রীমঙ্গলের লংলিয়া ছড়া পুঞ্জি। ছবি: লেখক
বর্ষায় ঘন সবুজ রূপ নিয়েছে চা বাগান। দুই পাশে চা পাতার সতেজ ঘ্রাণ, মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে ভেজা মেঠোপথ। এই কাদাময় পথ ধরে আমাদের যাত্রা। সফরসঙ্গী স্ত্রী পুনম ও কন্যা ওয়াফিকা। আর আমাদের গাইড নাহার টি গার্ডেনের বিনয়ী ম্যানেজার ইবাদ ভাই, যার আন্তরিক আতিথেয়তায় আমরা এই চা বাগানে রাত্রিযাপনের সুযোগ পেয়েছি। আমাদের গন্তব্য পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা এক খাসিয়াপুঞ্জি।
কিছুটা পথ এগোতেই বামে চোখে পড়ল পাহাড়ি গাছের ছায়ায় ঢাকা ছোট্ট এক নিরিবিলি গোরস্তান। ইবাদ ভাইয়ের তথ্যে জানতে পারলাম, এই গোরস্তানটিই লংলিয়া ছড়া পুঞ্জির বাসিন্দাদের শেষ ঠিকানা, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতিতে প্রিয়জনকে সমাহিত করা হয়।
একটু পরেই আমরা পৌঁছালাম পুঞ্জির মূল ফটকে। ফটক পেরিয়ে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সিঁড়ি বেয়ে এগোতেই চোখে পড়ল একটি গির্জা। তারপর সিঁড়ি ধরে পাড়ার মূল অংশে পা দিতেই বড় একটি উঠোন পেলাম। চারপাশে খাসিয়াদের ঘরবাড়ি। তবে আমার নজর কাড়ল একটা পুরনো জিপ। জিপের পেছনের অংশ কানায় কানায় পূর্ণ টাটকা কলা আর নানা পাহাড়ি ফলমূলে। বাগান থেকে সংগৃহীত এই ফলমূলগুলোই শহরের বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছে খাসিয়ারা।
লংলিয়া ছড়া একদম ধোয়ামোছা, ঝকঝকে তকতকে একটি পাড়া। তবে সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে এদের জীবনযাত্রার রূপ। ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-কাঠের ঘরের বদলে এখন আধপাকা ঘরের সংখ্যাই বেশি।
ইবাদ ভাইয়ের সঙ্গে অল্প কিছু সময়ের জন্য আমরা একটি খাসিয়া পরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করলাম। তারা আমাদের আপ্যায়ন করল তাদের নিজেদের বরজের বিখ্যাত ‘খাসিয়া পান’ দিয়ে। এই পান চাষই খাসিয়াদের প্রধান জীবিকা।
পাড়া ঘুরে বেড়ানোর সময় এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে আটকে গেল। এক বাড়ির বারান্দার কাঠের খুঁটিতে চারটা টিয়া পাখি খাঁচায় নয়, আলতো করে আটকানো। জানলাম, এই টিয়াগুলো ব্যবহার করেই গভীর জঙ্গল থেকে নতুন টিয়া পাখি ধরা হয়— পাহাড়ি জীবনের এক অতি প্রাচীন কৌশল!
ততক্ষণে ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বনের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নিচে এক পাহাড়ি ছড়া দূর থেকেই টানছিল। কাছে গিয়ে দেখলাম, ধাপে ধাপে পাথুরে সিঁড়ি নেমে গেছে একদম স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলের ছড়াটির দিকে। বৃষ্টিভেজা সেই সিঁড়ি ধরে হাতে গুলতি নিয়ে নেমে যাচ্ছে খাসিয়াদের দুটি ছোট্ট শিশু। ছড়ার বুনো জলে ঝরঝর বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে দেখে আমারও খুব ইচ্ছা হলো শিশুদের সঙ্গে গোসলে নেমে পড়ি! কিন্তু ওয়াফিকাকে ধরে রাখাই তখন দায়। আমার মেয়েটা খাসিয়া বাচ্চা দুটোর পিছু পিছু সেই বৃষ্টিভেজা ছড়ার দিকে অলরেডি ছুট লাগিয়েছে! সিলেট, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে রাত্রিযাপনে হোটেল-রিসোর্টের অভাব হবে না।
যেভাবে যাবেন: শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সরাসরি অটোরিকশায় কিংবা মোটরসাইকেলে লংলিয়া ছড়া বাগানে পৌঁছে যাবেন। বর্ষা মৌসুমে চান্দের গাড়িতে যেতে হবে।




