নীল কারখানার চিমনির খোঁজে

নরসিংদীর নীল কারখানার চিমনির সামনে লেখক
এখনো টিকে আছে দেশের কিছু নীলকুঠি ও নীল কারখানার চিমনি। নরসিংদী, মাদারীপুর ও মানিকগঞ্জের এমন তিন নীলকুঠির চিমনি নিয়ে লিখেছেন এলিজা বিনতে এলাহী
নীল চাষ, নীলকুঠি, নীল বিদ্রোহ কিংবা নীল চাষকে ঘিরে আমাদের কৃষকদের ওপর শোষণ-নিপীড়নের ইতিহাস জানেন না— এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর নীল উৎপাদনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও ধ্বংসাবশেষ, যেমন— নীলকুঠি, নীল কারখানা ও নীলকরদের সমাধি আজও ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ জুড়ে। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ব্রিটিশরা দুই শতাধিক নীলকুঠি ও নীল কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিল।
আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপে বস্ত্রশিল্পের চাহিদা মেটাতে ব্রিটিশ বণিকরা বাংলায় ব্যাপক নীল চাষ শুরু করে। কৃষকদের জোরপূর্বক দাদন দিয়ে উর্বর জমিতে নীল চাষে বাধ্য করায় দুর্ভিক্ষ ও চরম নির্যাতন নেমে আসে। এর বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ‘নীল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। পরে তদন্ত কমিশন গঠন ও কৃত্রিম রঞ্জক আবিষ্কারের ফলে এই চাষ বিলুপ্ত হয় এবং নীলকুঠিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে টিকে থাকা ভগ্নাবশেষ ও চিমনিগুলোই সেই আমলের বেদনাবিধুর শোষণের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মাহমুদাবাদ নীলকুঠি ও কারখানা
সেদিন শুক্রবার! সকালে রাজধানী কিছুটা ফাঁকা। গন্তব্য নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলা। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে টঙ্গী, সেখান থেকে অটোরিকশায় নরসিংদী সদর। তারপর আরশিনগর হয়ে আবার অটোরিকশায় চেপে মাহমুদাবাদ নীলকুঠি বাজার। এখানে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করতেই দেখিয়ে দিল চিমনির ধ্বংসাবশেষ। একটি মাঠের মতো স্থানে চিমনিটি দাঁড়িয়ে আছে। চার কৌণিক চুন-সুরকির স্থাপত্যটির উচ্চতা ৯০ ফুটের মতো হবে। চিমনির গোড়ার ফাঁকা স্থান দিয়ে চিমনির ভেতরে প্রবেশ করা যায়। মাঠের চারপাশে নতুন করে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে নীলকুঠি বা অন্যান্য স্থাপত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবুও এলাকার নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে নীল চাষ হতো এবং কারখানাও স্থাপন করা হয়েছিল।
শুনেছিলাম, এই এলাকার মিস্ত্রিবাড়ির লোকজন নীল চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখনো তাদের বংশধররা বসবাস করছেন এই এলাকায়। মিস্ত্রিবাড়ি গিয়ে পেলাম সেখানে জয়নাল সাহেবকে। তিনি জানালেন, তার দাদা মনু ওরফে মনোহর মিস্ত্রি কাজ করতেন নীল কারখানায়। একসময় রায়পুরা এলাকায় কোনো বসতি ছিল না। রায়পুরা এলাকায় তিনজন ব্রিটিশ বসতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তারা হলেন জি পি ওয়াইজ, ডব্লিউ ওয়াটস ও জর্জ লেমন। ফ্যাক্টরিতে নীল উৎপাদনের জন্য শ্রমিকের দরকার হতো। মনোহর মিস্ত্রিকে নিয়ে আসা হয় যশোর থেকে। কথা হয় জয়নাল আবেদীনের বড় ভাই আবদুল মোমেনের সঙ্গেও। বাবার কাছ থেকে জানা গল্পগুলো থেকে দুই ভাই স্মৃতিচারণ করেন। তারা তাদের দাদা মনোহর মিস্ত্রিকে দেখেননি। চিমনির পাশে আরও স্থাপত্য ছিল, যেগুলো কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে।
কোনো কোনো অঞ্চলে নীলকুঠি আর কারখানা একই চত্বরে স্থাপন করা হয়
আউলিয়াপুর নীল কারখানা
মাদারীপুর জেলার প্রাচীন নাম ইদিলপুর। তখন ইদিলপুর চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা রাজ্যের একটি উন্নত জনপদ ছিল (চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা বর্তমানের বরিশাল)। ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জে একাধিকবার ভ্রমণ করলেও ২০১৯ সালের পর মাদারীপুর ভ্রমণ আর হয়ে ওঠেনি। প্রতি বছরই ঈদের দিন আধবেলা ঐতিহ্য ভ্রমণে যাই পরিবারসহ। গত ঈদে মাদারীপুর বেছে নেওয়ার কারণ নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ পরিভ্রমণ করা।
সকালে নিজস্ব বাহনে রওনা করলাম মাদারীপুরের উদ্দেশে। পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর তথাকথিত নগর ও যত্রতত্র আধুনিক বাজার পেরিয়ে যখন শুধু গ্রামীণ পরিবেশে প্রবেশ করলাম, পথে পথে গুলমোহরের রঙ মনকে আন্দোলিত করল। শুধু কি গুলমোহর! গ্রীষ্মের জারুল, সোনালুতে ছেয়ে আছে পুরো মাদারীপুর। দেখছি আর ভাবছি, কয়েক বছরে কেমন বদলেছে এই জনপদ! ইট-সিমেন্টের স্থাপনা বেড়েছে, পথঘাট উন্নত হয়েছে, প্রত্নস্থলগুলো আরও জীর্ণ হয়েছে।
মূল বিষয়ে আসি, সেটি হলো নীলকুঠি। মাদারীপুরে নীল চাষের ইতিহাস পাওয়া যায় ১৮২৬ সালের দিকে। এ অঞ্চলের ব্রিটিশ নীলকর ছিলেন ডানলপ। এখন যে নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, স্থাপনার অবয়ব বলে এটি নীল কারখানা ছিল। ঢাকা বিভাগের আরও দুটি জেলায় এ রকম চিমনি দেখেছি আমি। দক্ষিণাঞ্চলের আর কোনো জেলায়, যেমন— যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, খুলনা কিংবা বরিশালে আমি দেখিনি। সেখানকার সবকটিই নীলকুঠি; কারখানা নয় বলেই অনুমান করি। রাজশাহী, মাগুরা ও নড়াইলে আমি নীল কারখানার চিমনি দেখেছি।
যেখানে নীলকররা অবস্থান করতেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলত সেটা নীলকুঠি আর চিমনি সংযোজিত জায়গায় নীল উৎপাদন হতো। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে নীলকুঠি আর কারখানা একই চত্বরে স্থাপন করা হয়। নীলকর ডানলপের সমাধি আমি দেখেছি ফরিদপুরে।
এই চিমনিও চারকোনা। কারখানার প্রাচীরের কিছু অংশ টিকে রয়েছে। ছোট ছোট খোপ খোপ কিছু জলাধারের মতো স্থান দেখলাম, হয়তো নীল শুকানো হতো সেখানে। এই চত্বরে কিছুটা হলেও কারখানার অবয়ব টের পাওয়া যায়, তবে নীলকুঠির কোনো অবয়ব খুঁজে পাইনি।
শরীয়তপুর ও মাদারীপুর উভয় জেলার ইতিহাসেই এই কারখানার কথা লেখা রয়েছে। তৈরি হয়েছিল ১২ একর জায়গা জুড়ে। পাশের নীলকুঠি নামক বাজারও মনে হয় গড়ে উঠেছে নীল কারখানার জায়গায়। মাদারীপুর জেলার ছিলারচর এলাকার আউলিয়াপুর গ্রামে এই নীল কারখানার অবস্থান। আবার শরীয়তপুর জেলা থেকে মাহমুদপুর ইউনিয়নে গেলে এই নীল কারখানা দেখতে পাওয়া যায়।
নীলটেক নীল কারখানা
ভ্রমণ করতে করতে বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে আমার। ফোনে যখন জানতে চেয়েছিলাম মানিকগঞ্জের নীলকুঠির ঠিকানা, শতভাগ মানুষ একবাক্যে বলে দিয়েছিলেন মানিকগঞ্জে কোনো নীল কারখানা নেই। যখন প্রায় হতাশ অবস্থা, ঠিক সে সময় মনে পড়ল সেখানকার কলেজের শিক্ষক অপু ভাইয়ের কথা। তিনি আমার বন্ধুপ্রতিম বড় ভাই। তাকে জানালাম নীল কারখানার চিমনির কথা। তিনি শুধু পথ বাতলে, একজন স্থানীয় তরুণকে সঙ্গী করে দিলেন চিমনির সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সিংগাইর উপজেলার জয়মণ্টপ ইউনিয়নের নীলটেক বাজার এলাকায় এই নীল কারখানাটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ আলো-আঁধারিতে স্থানটি, চারদিকে গাছপালা। টিকে রয়েছে কেবল আকাশ ফুঁড়ে ওঠা চিমনি আর তার সঙ্গে একচিলতে দেয়াল। ব্রিটিশ আমলে সিংগাইর এলাকায় নীল চাষ করা হতো। সেই নীল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য এই নীল কারখানাটি স্থাপন করা হয়। এই নীল কারখানাটির নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে নীলটেক।



