আর্জেন্টিনার মেঘ ফুঁড়ে যাওয়া রেলপথ

আন্দিজ পর্বতমালার বুক চিরে ছুটে চলা সেই ট্রেনের নাম ট্রেন আ লাস নুবেস
বর্ষায় আমাদের পাহাড় অনেক সুন্দর। বান্দরবান কিংবা রাঙামাটির কোনো পাহাড়ের মাথায় দাঁড়ালে দেখা যায়, মেঘ নিচে নেমে এসেছে। দূরের পাহাড়গুলো হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। মনে হয়, আর কয়েক কদম এগোলেই মেঘের ভেতরে ঢুকে পড়া যাবে। এদিকে এখন চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। খেলা যুক্তরাষ্ট্রে হলেও দেশে কোটি কোটি আর্জেন্টিনা ভক্তের ঘুম হারাম। নীল-সাদা জার্সি, উন্মাদনা, রাতজাগা খেলা— সব মিলিয়ে দেশটি নিয়ে বিশ্বকাপ উন্মাদনা তুঙ্গে। কিন্তু আর্জেন্টিনার আরেকটি বিস্ময় আছে, যার সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই। সেটি এমন একটি রেলপথ, যেখানে ট্রেন পাহাড়ে ওঠে, মেঘের ভেতর ঢুকে যায়, আবার কখনো মেঘকে নিচে ফেলে আরও ওপরে উঠে যায়। বর্ষা আর বিশ্বকাপের মৌসুমে তাই শোনাব ওই রেলপথের গল্প।
আন্দিজ পর্বতমালার বুক চিরে ছুটে চলা সেই ট্রেনের নাম ট্রেন আ লাস নুবেস— বাংলায় যার অর্থ, মেঘের পথে ট্রেন।
সালতা শহরের সকালটা অন্য রকম। সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পরই পাহাড়ের ছায়া সরে যেতে থাকে। স্টেশন এলাকায় তখন ভ্রমণকারীদের ব্যস্ততা। কেউ ক্যামেরার ব্যাটারি পরীক্ষা করছেন, কেউ অক্সিজেন কমে গেলে কী করবেন, তা নিয়ে কথা বলছেন। কারণ এই যাত্রার শেষ গন্তব্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ২২০ মিটার বা ১৩ হাজার ৮৪৫ ফুট উচ্চতায়। সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতলের তুলনায় অনেক কম। এই রেলপথের রোমাঞ্চ শুরু হয় আসলে ট্রেনে ওঠারও আগে। বর্তমানে সালতা থেকে সরাসরি পুরো পথ ট্রেনে যাওয়া হয় না। প্রথমে বাসে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয় সান আন্তোনিও দে লস কোবরেস শহরে। প্রায় তিন ঘণ্টার এই পথটুকুতেই আন্দিজের রূপ বদলাতে শুরু করে। সবুজ কমে আসে। পাহাড়ের গায়ে দেখা দেয় লাল, বাদামি, ধূসর আর হলুদ রঙের স্তর। লাখো বছর ধরে বাতাস, বৃষ্টি আর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইতিহাস যেন খোলা বইয়ের পাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার দুই পাশে।
সান আন্তোনিও দে লস কোবরেস থেকে শুরু হয় আসল অধ্যায়। ট্রেনটি ধীরে ধীরে স্টেশন ছাড়ে। প্রথম কয়েক মিনিট দেখে বোঝার উপায় নেই সামনে কী অপেক্ষা করছে। তারপরই পাহাড়ের বাঁক শুরু হয়। একদিকে খাড়া পাথরের দেয়াল, অন্যদিকে গভীর খাদ। কোথাও শুকিয়ে যাওয়া নদীর খাত, কোথাও আবার পাহাড়ি ঝরনা। ট্রেনটি খুব দ্রুত চলে না। কারণ এখানে নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর ধীরগতির আরেকটি সুবিধাও আছে। জানালার বাইরে প্রতিটি দৃশ্যকে সময় নিয়ে দেখা যায়।
যত ওপরে ওঠা যায়, দৃশ্য তত বদলে যায়। গাছপালা কমতে থাকে। ঝোপঝাড়ও একসময় হারিয়ে যায়। চারদিকে শুধু পাথুরে পাহাড়। দূরে কোথাও আন্দিজের বরফঢাকা চূড়া। আবার কোথাও পাহাড়ের মাথা মেঘে ঢেকে আছে। অনেক সময় ট্রেন এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায়, যখন মেঘগুলোকে আর মাথার ওপরে নয়, নিচে ভাসতে দেখা যায়। এমন দৃশ্য পৃথিবীর খুব কম রেলপথেই দেখা সম্ভব।
এই রেলপথের সবচেয়ে বড় বিস্ময় শুধু এর উচ্চতা নয়, এর প্রকৌশলও। সাধারণত পাহাড়ে খুব দ্রুত উচ্চতায় উঠতে হলে র্যাক রেলওয়ে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ রেললাইনের মাঝখানে দাঁতের মতো আরেকটি লাইন থাকে, যা ধরে বিশেষ চাকার সাহায্যে ট্রেন ওপরে ওঠে। কিন্তু ট্রেন আ লাস নুবেসে সেই ব্যবস্থা নেই। তাহলে এত উঁচু পাহাড়ে ট্রেন ওঠে কীভাবে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে রেলপথের নকশায়। প্রকৌশলীরা পাহাড়ের গা ঘেঁষে এমনভাবে লাইন এঁকেছেন, যাতে ট্রেন সরাসরি খাড়া ঢালে না উঠে ধীরে ধীরে উচ্চতা অর্জন করতে পারে। কোথাও বড় বাঁক, কোথাও বৃত্তাকার লুপ, কোথাও আবার জিগজ্যাগ পথে এগোয় ট্রেন। একই পাহাড়কে বিভিন্ন দিক থেকে ঘুরে ঘুরে অতিক্রম করে। ফলে ইঞ্জিনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে না, আবার যাত্রীও খুব বেশি খাড়া ঢালের অনুভূতি পান না। এই কৌশলের কারণেই রেলপথটিকে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের কাছেও একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
পুরো রুটে রয়েছে ২৯টি সেতু, ২১টি সুড়ঙ্গ, ১৩টি ভায়াডাক্ট, দুটি সর্পিল লুপ এবং দুটি জিগজ্যাগ অংশ। কোথাও ট্রেন পাহাড় কেটে তৈরি সুড়ঙ্গে ঢুকে যায়, কয়েক সেকেন্ড পরই বেরিয়ে আসে সূর্যের আলোয়। আবার কিছু দূর গিয়ে বিশাল লোহার সেতুর ওপর উঠে পড়ে। নিচে শত শত ফুট গভীর উপত্যকা। ট্রেনের জানালায় মুখ রাখলে বোঝা যায়, প্রকৃতি আর প্রকৌশল এখানে হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে।
এই অসম্ভব রেলপথের নকশা করেছিলেন মার্কিন প্রকৌশলী রিচার্ড ফন্টেন মাউরি। বিশ শতকের শুরুতে যখন তিনি এই প্রকল্প হাতে নেন, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, আন্দিজের এমন দুর্গম অংশে রেললাইন বসানো বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু মাউরি পাহাড়কে জোর করে বদলাতে চাননি। বরং পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনকে অনুসরণ করেই রেলপথের নকশা তৈরি করেন। সেই সিদ্ধান্তই আজও এই রেলপথকে বিশ্বের অন্যতম প্রকৌশল বিস্ময় হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু এত কষ্ট করে কেন বানানো হয়েছিল এই রেলপথ? কেন একটি ট্রেনকে মেঘের এত কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল? আর যাত্রার শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে কী?
রেলপথটি নির্মাণের পেছনে অবশ্য পর্যটনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিশ শতকের শুরুতে আন্দিজের এই অঞ্চলে বোরাক্সের বিশাল খনি আবিষ্কৃত হয়। কাচ, সিরামিক, সার ও নানা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত এই খনিজ পাহাড় থেকে সমতলে নামিয়ে আনা ছিল কঠিন কাজ। তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এমন একটি রেলপথ নির্মাণের, যা আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে আন্দিজ পেরিয়ে চিলির সঙ্গে যুক্ত করবে। কাজ শুরু হয় ১৯২১ সালে। প্রায় ২৭ বছরের শ্রম, বিস্ফোরণ, পাথর কাটা আর হাজারো শ্রমিকের ঘাম শেষে ১৯৪৮ সালে চালু হয় এই রেলপথ। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে রেলপথটি তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বাণিজ্যিক পরিবহন প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। অথচ অন্য একটি বিষয় দ্রুত সবার নজর কাড়ে। পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই ট্রেনে বসে এত উঁচুতে ওঠা যায়। আর সে কারণেই ধীরে ধীরে মালবাহী রেলপথ বদলে যেতে শুরু করে পর্যটনের আকর্ষণে।
'ট্রেন আ লাস নুবেস'— অর্থাৎ মেঘের পথে ট্রেন নামটিও এসেছে পরে। ষাটের দশকে কয়েকজন শিক্ষার্থী এই পথে ভ্রমণের সময় একটি তথ্যচিত্র ধারণ করেন। সে সময় বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের ধোঁয়া ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাসে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে দূর থেকে মনে হচ্ছিল, ট্রেনটি মেঘের ভেতর দিয়ে চলছে। সেই তথ্যচিত্রের নাম ছিল ট্রেন আ লাস নুবেস। পরে নামটিই এত জনপ্রিয় হয়ে যায় যে, সরকারি রেল কর্তৃপক্ষও সেটিই গ্রহণ করে।
ট্রেনটি যত এগোতে থাকে, ততই সামনে দেখা দিতে শুরু করে যাত্রার সবচেয়ে প্রতীক্ষিত অংশ, লা পলভরিলা ভায়াডাক্ট। দূর থেকে প্রথমে দেখা যায় লোহার তৈরি বিশাল একটি কাঠামো। পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা লালচে রঙের সেতুটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। তারপর একসময় ট্রেন উঠে পড়ে তার ওপর। লা পলভরিলা ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৪ মিটার, অর্থাৎ ৭৩৫ ফুটেরও বেশি। উপত্যকার মাটি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৬৩ মিটার বা ২০০ ফুট। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর অবস্থান ৪ হাজার ২২০ মিটার— প্রায় ১৩ হাজার ৮৪৫ ফুট।
ট্রেন যখন সেতুর মাঝখানে পৌঁছায়, তখন অনেকেই কথা বলা বন্ধ করে দেন। ডানদিকে তাকালে শুধু পাহাড়। বাঁ দিকে তাকালে গভীর উপত্যকা। নিচে কোনো নদী নেই, নেই সবুজ বন। আছে পাথর, বাতাস আর হাজার হাজার বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস। বাতাস এতটাই পাতলা যে, দ্রুত হাঁটলে শ্বাস কিছুটা ভারী লাগতে পারে। তাই ট্রেন থেকে নামার পর সবাইকে ধীরে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে বোঝা যায়, কেন এত মানুষ শুধু এই কয়েক মিনিটের অভিজ্ঞতার জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেন।
এখানে কোনো জলপ্রপাত নেই। নেই ঘন বন কিংবা রঙিন ফুলের সমারোহ। তবু দৃশ্যটি মনে গেঁথে যায়। কারণ এখানে প্রকৃতির বিশালত্ব মানুষকে ছোট করে দেয়। আপনি বুঝতে পারেন, পাহাড়ের বয়স লাখ লাখ বছর, আর আপনার এই সফর কয়েক ঘণ্টার। অনেকে বলেন, মেঘ স্পর্শ করা যায়। আসলে বিষয়টি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। আন্দিজের আবহাওয়া খুব দ্রুত বদলে যায়। কোনো দিন ভায়াডাক্টের নিচ দিয়ে মেঘ ভেসে যায়। কোনো দিন আবার মেঘ উঠে এসে পুরো সেতুকে ঢেকে ফেলে। পরিষ্কার দিনে দূরের আগ্নেয় পাহাড় পর্যন্ত দেখা যায়। আর মেঘলা দিনে মনে হয়, ট্রেনটি যেন আকাশের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে 'মেঘের পথে ট্রেন'— এই কাব্যিক পরিচয়।
রেলপথটির ইতিহাসে অবশ্য উত্থান-পতনও কম নেই। ১৯৯০-এর দশকে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়। ২০০৫ সালে উচ্চতায় একটি ট্রেন বিকল হয়ে পড়লে শত শত যাত্রীকে উদ্ধার করতে হয়। ২০১৪ সালে আরেকটি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর সালতা প্রাদেশিক সরকার দায়িত্ব নিয়ে রেললাইন, সেতু, ইঞ্জিন ও বগির বড় ধরনের সংস্কার করে। বর্তমানে এটি আর্জেন্টিনার অন্যতম জনপ্রিয় হেরিটেজ রেলভ্রমণ। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো পর্যটক এই অভিজ্ঞতার জন্য সালতায় আসেন।
বাংলাদেশ থেকে এই রেলপথে যেতে চাইলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে। ঢাকা থেকে সাধারণত দোহা, দুবাই, ইস্তাম্বুল বা ইউরোপের কোনো শহর হয়ে সেখানে যাওয়া যায়। এরপর সেখানকার উড়োজাহাজে সালতা। সালতায় অন্তত এক রাত কাটানো ভালো। কারণ পরদিন খুব সকালে যাত্রা শুরু হয়। আগেভাগে টিকিট বুক করাও জরুরি। পর্যটনের মৌসুমে অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ আগেই আসন পূর্ণ হয়ে যায়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এই ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ৪ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায়। যাদের হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা উচ্চতাজনিত সমস্যা আছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ। পর্যাপ্ত পানি পান করা, ধীরে হাঁটা এবং শরীরকে সময় দেওয়াই উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়।
বাংলাদেশের বর্ষায় জানালার ওপারে ভেসে বেড়ানো মেঘ দেখে যদি কখনো মনে হয়, মেঘের আরও কাছে যাওয়া যায় কি না, তাহলে উত্তরটি লুকিয়ে আছে আন্দিজ পর্বতমালায়। সেখানে একটি ট্রেন ধীরে ধীরে পাহাড়ে ওঠে। সুড়ঙ্গ পেরোয়। সেতু পার হয়। তারপর এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে যায়, যেখানে অনেক সময় মেঘ আর আকাশের মাঝখানে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। হয়তো সেই কারণেই একে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ট্রেনযাত্রার একটি নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রেলপথগুলোর একটি বলা হয়।
সূত্র: আর্জেন্টিনা ট্রাভেল, ত্রেন আ লাস নুবেস, সালতা গভিয়ের্নো, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, উইকিপিডিয়া












