মহাবিপর্যয়
আনচেলত্তির চাকরি থাকছে তো?

চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায়টাকে অনেকেই দুর্ভাগ্য বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তারও চার বছর আগে বেলজিয়ামের কাছে হারটিতেও ছিল ভাগ্যের একটুখানি দায়। কিন্তু এবার উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হেরে শেষ ১৬ থেকে সেলেসাওদের ছিটকে যাওয়া মোটেও কোনো দুর্ভাগ্য নয়; বরং এটি ব্রাজিলের ফুটবলের জন্য এক চরম ও অনস্বীকার্য বিপর্যয়।
গত বছরের মার্চে আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর দলের ভাঙন থামাতে ‘ব্যান্ড-এইড’ হিসেবে আনা হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬ ম্যাচের ১০টিতে জিতে বাছাইপর্বের খরা কাটিয়েছিলেন এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড। তবে বিশ্বমঞ্চের আসল পরীক্ষায় এসে দেখা গেল, এই জোড়াতালির দল দিয়ে আর চলছে না।
ব্রাজিলের ফুটবলে এখন বড় ধরনের ‘সার্জারি’ বা আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সেটা শুরু করতে সাম্বা ফুটবলের প্রাণ মিডফিল্ড থেকেই। নরওয়ের মতো দলের কাছে মাঝমাঠের দখল হারিয়ে ব্রাজিলের এভাবে ছিটকে যাওয়াটা অবিশ্বাস্য। অথচ ব্রাজিল দল সৃজনশীল মিডফিল্ডার তৈরি করা বন্ধ করে এখন শুধু উইঙ্গার তৈরিতে ব্যস্ত। এই টুর্নামেন্টে আনচেলত্তি যেন কাসেমিরোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ১৮ মাস দূরে থাকা কাসেমিরোকে দলে ফিরিয়ে তিনি ডিফেন্সের সুরক্ষা দিতে চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু উন্মুক্ত মাঠে কাসেমিরোর ধীরগতি নরওয়েজিয়ানদের জন্য সুযোগের দুয়ার খুলে দেয়। তার ওপর কোয়ার্টারের আগে ইনজুরিতে পড়েন লুকাস পাকেতা। আনচেলত্তির দলে পাকেতার বিকল্প কোনো ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডার ছিলই না। স্কোয়াডে মাত্র পাঁচজন মিডফিল্ডার নিয়ে আসার খেসারত দিতে হয়েছে তাঁকে।
বাধ্য হয়ে আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে নামানোয় ব্রাজিলের আক্রমণভাগ পুরোপুরি কাউন্টার-অ্যাটাক বা গতিশীল আক্রমণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা নরওয়ের রক্ষণ সহজেই বোতলবন্দি করে ফেলে। সবচেয়ে বড় ভুলটি আনচেলত্তি করেছেন নেইমারকে নিয়ে। চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমার যে তার আগের ফর্মের ধারেকাছেও নেই, তা সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্পষ্ট ছিল। তবু জনমতের চাপে আনচেলত্তি নেইমারকে দলে নেন। গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নেইমারকে দেখে মনে হয়েছিল, কোনো দাতব্য ম্যাচ খেলতে নেমেছেন।
নরওয়ের বিপক্ষে মরণপণ লড়াইয়ে নেইমারকে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানোয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং এনদ্রিককে উইংয়ে অনেক নিচে নেমে খেলতে হয়েছে, যা তাদের চেনা ছন্দ নষ্ট করে দেয়। ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে এক গোল করলেও পুরো ম্যাচে নেইমারের অবদান ছিল হতাশাজনক। উল্টো মেজাজ হারিয়ে লাল কার্ড দেখার হাত থেকে বেঁচে যান তিনি।
২০১০ সালে নিউ জার্সির এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। আজ সেখানেই শেষ হলো এক বর্ণিল কিন্তু ট্র্যাজিক অধ্যায়। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ইঙ্গিত দিয়ে ৩৬ বছর বয়সী নেইমার বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি... কিন্তু এখন সব শেষ। যেখানে শুরু করেছিলাম, সেখানেই শেষ করলাম।’
এত বড় বিপর্যয়ের পরও অবশ্য পদত্যাগের কোনো আভাস দেননি কার্লো আনচেলত্তি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, এটা শেষ। এটা আসলে একটা নতুন চক্রের শুরু। আমরা ব্রাজিলের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাব, নতুন আইডিয়া নিয়ে আসব। ফুটবলে পরাজয়ের স্বাদ মেনে নিয়েই আমাদের সামনে এগোতে হবে।’
চুক্তি অনুযায়ী ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের ডাগআউটে থাকার কথা আনচেলত্তির। বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠা ব্রাজিলের জন্য বেশ সহজ। কারণ, আয়োজক হিসেবে আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে সরাসরি খেলবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে চুটকিতে ট্রফি জেতানো আনচেলত্তি কি ব্রাজিলের এই বুড়িয়ে যাওয়া দলটাকে খোলনলচে বদলে ফেলার মতো ‘সার্জন’ হতে পারবেন? নাকি ব্রাজিলের সোনালি ট্রফি খরা ঘোচাতে নতুন কোনো দেশি কোচের হাতেই তুলে দেওয়া হবে সেলেসাওদের দায়িত্ব? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা রইল।








