সুন্দরবনের গহিনে

সুন্দরবনে বেঙ্গল টাইগার। ছবি: মনিরুল খান
রাত আরেকটু গভীর হলে আমাদের ছোট্ট দলটি বেরিয়ে পড়ল। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদে ভুতুড়ে অন্ধকার দূর তো হচ্ছেই না, বরং একটু একটু করে ঠেলে দিচ্ছে যেন রহস্যময় আঁধারের দিকে। বোটের ইঞ্জিনের ভটভট ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। সেটিও থেমে গেল খানিক বাদেই। নদী থেকে একটা খালে ঢুকে পড়লাম আমরা। আমাদের চালক বন্ধুটি সন্তর্পণে আধডোবা এক ঝাঁকড়া মতন কেওড়ার ডালের সঙ্গে নোঙর করলে আমরা গল্প জুড়ে দিলাম।
গল্পের ফাঁকে ফাঁকেই আমাদের দলনেতা টর্চের আলো ফেলে এদিক-সেদিক দেখছিলেন। ভাটার স্রোতের টানে গাছের ডালপালা ভেসে যাচ্ছে। ওরই মধ্যে কোনটা কুমির কে বলবে? তা ছাড়া তীরের পাঁক-কাঁদায় কুমির গুঁড়ি মেরে বসে থাকলেও বোঝা দুষ্কর। আমাদের এক পোড়খাওয়া বন্ধু তার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন, আর আমরাও তাতে বুঁদ হয়ে ছিলাম। নদী থেকে ধেয়ে আসা পাতলা ফিনফিনে কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে সব। হঠাৎ খুব কাছেই কোথাও চিত্রলের সাবধানী ‘ক্কেউ’ আওয়াজে চমক ভাঙল। মাংসাশী কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেয়েছে হরিণটা। ডেকে সাবধান করছে দলের বাকি সদস্যদের। খালটা এখানে বেজায় সরু, এমনকি আমাদের মাঝারি আকারের ডিঙি নৌকা ঘোরানোও সহজ নয়। বাঘ হয়ে থাকলে যে পাড়েই থাকুক, এক লাফে বোটে উঠে পড়া ওর জন্য নিদেনই ডাল-ভাত। বাঘ না-ইবা দেখলাম, কাছপিঠেই বাঘ এসেছে— এ তো জানা গেল!
দুই
মাত্রই জঙ্গলে দীর্ঘ, ক্লান্তিকর হাইকিং সেরে, নাকেমুখে কিছু গুঁজে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি। এমন সময় দলনেতা হাঁক দিলেন, টাইগার টিলার দিকে একটা ‘ছোট্ট হাঁটা’ দেওয়ার জন্য। দলনেতার অনুরোধে রাজি হয়ে গেলাম। যাই হোক, বোট যখন আমাদের ঘাটে নামিয়ে দিল, তখন বিকাল ঢলে এসেছে। হঠাৎ মনে পড়ল, আমার আসরের নামাজ তখনো পড়া হয়নি। কেউ একজন বুদ্ধি বাতলে দিল, সামনেই কটকার বিট অফিস। ওখানে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা না থেকেই যায় না।
তথাস্তু!
দলনেতা নিপাট ভদ্রলোক। আমাকে আশ্বস্ত করলেন, ফেরার পথে তিনি আমাকে তুলে নিয়ে যাবেন।
সুতরাং দলের সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমি বিট অফিসের দিকে পা বাড়ালাম।
জঙ্গলের বিট অফিসের ধারের পুকুর খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না। কচুরিপানায় ভরা। যেই না মুখে পানি দিয়েছি, ওমনি আমার অস্বস্তি হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ ঠাহর করার চেষ্টা করলাম, কীসে অস্বস্তি হচ্ছে! খেয়াল হলো, ঝিঁঝির ডাক বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ নীরবতার জন্যই কি অস্বস্তি হচ্ছে?
কিন্তু ঝিঁঝির ডাক হঠাৎ বন্ধ হলোই বা কেন? আশপাশে ভালো করে লক্ষ করলাম। নিস্তব্ধ জলা, ঝোপঝাড় আর বনভূমি। পরে বিট অফিসারের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় জানা গেল, ওই দীঘিতে প্রায়ই বাচ্চাসহ বাঘিনী জল খেতে আসে।
নামাজ শেষে যখন বিট অফিস থেকে বেরোলাম, তখন চাঁদের আলো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো আলো নেই। সামনেই একপশলা জঙ্গল। বাঘ যদি ওখানে গুঁড়ি মেরে পড়ে থাকে, আমার বাপেরও বোঝার সাধ্যি নেই। নদীর তীর ঘেঁষেই ফিরব, ঠিক করলাম। সেদিন কীভাবে একা একা ওই রাস্তা দিয়ে ফিরেছিলাম, সেটি ভাবলেও গা কাঁটা দেয়।
শরণখোলা রেঞ্জ
ডিসেম্বর, ২০২০
লক্ষ রাখবেন
জঙ্গল মানেই চরম সতর্কতা এবং বাঘের রাজত্বে পূর্ণ বিনয়। ট্রিপ সফল করার জন্য দলনেতার নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া উচিত। সুন্দরবনের সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণী দেখার জন্য বনের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা জরুরি। ট্র্যাকিংয়ের সময় দলছুট হওয়া যাবে না, কারণ বাঘ সাধারণত পেছন থেকেই আক্রমণ করে।
কীভাবে ও কখন সুন্দরবনে যাবেন
সুন্দরবন ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। তবে সেপ্টেম্বরে সবার জন্য উন্মুক্ত হয় বনটি। সাধারণত সুন্দরবনের তিন দিন দুই রাতের স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ ট্যুরে জনপ্রতি ৮ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে।
সাধারণ ট্যুর অপারেটরদের লঞ্চ ভ্রমণের পাশাপাশি বর্তমানে সুন্দরবনের আশপাশে বেশ কিছু সুন্দর ইকো-রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। মোংলা, করমজল বা সুন্দরবনের পাড়ঘেঁষে তৈরি এসব রিসোর্টে এখন সারা বছরই ভ্রমণপিপাসুরা পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেড়াতে যেতে পারেন। এসব রিসোর্টে দুই রাতের ভ্রমণে জনপ্রতি ১২ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে।



