টোটো কোম্পানি
এক যাত্রায় ঝরনা ও চা বাগানে

বান্দরবানের এক চা বাগান ও ঝরনা ঘুরে এসে লিখেছেন আরজাত হোসেন
অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই স্বর্গরাজ্যে পা রাখার সুযোগ হয়েছে আমার এই বর্ষায়। মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি আর নির্জন অরণ্যের বুক চিরে অ্যাডভেঞ্চারের সেই অনুভূতি বহুদিন মনে থাকবে। গল্পটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা গ্রামের মোহনীয় সোনালি ঝরনা আর সবুজ গালিচায় মোড়া আশারতলি চা বাগানের।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল কক্সবাজারের রামু শহর থেকে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা গ্রামে পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দুই-আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হলো। চারপাশের বাহারি গাছগাছালির ছায়ায় শান্ত-সুনসান পথ ধরে নিঃশব্দে হেঁটে চলছি। পাহাড়ি উঁচু টিলায় উঠে যখন তাকাচ্ছিলাম, চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অগণিত পাহাড়ের চূড়া, যেন রুপালি মেঘের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে তারা।
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে চোখে পড়েছিল ছোট ছোট কুটির। প্রায় ৫০টির মতো পাহাড়ি পরিবার সেখানে বাস করে। পাহাড়ের বুক চিরে পিচ্ছিল পথ ধরে এগিয়ে চলা, কখনো আবার পাহাড়ি ছড়ার ছোট ছোট পাথরের ওপর পা ফেলে হেঁটে যাওয়া। কানে যখন অবিরাম জল পতনের কলতান বাজতে শুরু করল, বুঝলাম ঝরনা আর বেশি দূরে নয়। শেষ বাঁকটা ঘুরতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অসাধারণ দৃশ্য! জলের সূক্ষ্ম অণুকণা কুয়াশার মতো চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১৪০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে সগৌরবে গর্জন তুলে আছড়ে পড়ছে ঝরনার শীতল ধারা।
এমন সুন্দর পরিবেশ পেয়ে আমরা কি আর স্থির থাকতে পারি? গা ভাসিয়ে দিলাম ঝরনার হিমশীতল জলে। ঝরনার পাশেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে ফুটে থাকা বুনো ফুল আর ফলের গাছের মেলা।
পথটি লোকালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় খুব একটা ভয় না থাকলেও পাহাড়ের পিচ্ছিল ঢালে চলাচলে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়েছে। তা ছাড়া পাহাড়ে জোঁকের উৎপাত প্রচুর, তাই প্রতিমুহূর্তে পায়ের দিকে নজর রাখতে হচ্ছিল। আমরা এ অ্যাডভেঞ্চারে পায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘অ্যাংকেল ব্যান্ড’ ব্যবহার করেছিলাম, যা বেশ কাজে দিয়েছিল।
ঝরনার রূপমাধুরী পান করে আমরা ৫-৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রওনা হলাম আশারতলি চা বাগানের উদ্দেশে। পাহাড় কেটে তৈরি করা এ নির্জন পথ দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশের গাঢ় সবুজ অরণ্য যেন এক মায়াবী জগতে নিয়ে গেল। অবশেষে যখন চা বাগানে পা রাখলাম, নিমেষে মনে হলো যেন এক টুকরো সিলেট ভেসে উঠেছে বান্দরবানের এই পাহাড়ে! পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত সিঁড়ির মতো খাঁজকাটা ও শৈল্পিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা চা গাছের সারি চোখ জুড়িয়ে দিল। বাগানের এক অংশে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে লেবুবাগান। একদিকে চায়ের সুবাস, অন্যদিকে লেবুপাতার তাজা গন্ধ— দুটো মিলে দারুণ লাগল।
ভ্রমণ তথ্য
- সোনালি ঝরনা ও আশারতলি চা বাগান ভ্রমণের উপযুক্ত সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। তবে ভারী বৃষ্টির দিনে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস থেকে সতর্ক থাকুন।
- গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতা, প্রয়োজনীয় অ্যাংকেল ব্যান্ড, অতিরিক্ত শুকনো পোশাক, ফার্স্ট-এইড কিট, রেইনকোট এবং মোবাইল/ক্যামেরা সুরক্ষার জন্য ওয়াটারপ্রুফ পলিথিন ব্যাগ সঙ্গে রাখুন।
- ঢাকা থেকে কক্সবাজার বা রামু হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে পৌঁছান। সেখান থেকে অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল রিজার্ভ করে চাকঢালা যাবেন। তারপর হেঁটে সোনালি ঝরনা ও আশারতলি চা-বাগান।






