মশা কামড়ায় ত্বক বুঝে!

গ্রীষ্মকাল এলেই আমাদের অনেকের মনে এক চিরচেনা প্রশ্ন জাগে— কেন কিছু মানুষ মশার কামড়ে জর্জরিত হন আর কেউ কেউ মশার আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে দিন কাটিয়ে দেন? এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। লিখেছেন সিরাজাম মুনিরা
তেজগাঁও রেলস্টেশনে গাজীপুর যাওয়ার বিকালের ট্রেন লেট। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বসে বসে অপেক্ষা করছেন আর হাত দিয়ে ঘিরে ধরা মশা তাড়াচ্ছেন। এমন সময় খেয়াল করলেন— পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি দিব্যি স্মার্টফোনে স্ক্রল করছেন। তার কাছে একটা মশাও যাচ্ছে না। ভাবছেন, লোকটা জাদুটোনা জানে নাকি? সম্প্রতি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা এই চিরন্তন রহস্যের ওপর নতুন আলো ফেলেছে। গবেষকদের নতুন তথ্য অনুযায়ী, মানুষের শরীরের রাসায়নিক গঠন এবং ত্বকের মাইক্রোবায়োম বা ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে মশা বিভিন্ন মানুষকে ভিন্নভাবে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে।
‘আইসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নতুন উপায় তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিউরোজেনেটিসিস্ট এবং এই গবেষণার অন্যতম গবেষক ম্যাথিউ ডি জেন্নারো বললেন, ‘মানুষের মশার কামড়ের শিকার হওয়ার ঝুঁকি কতটুকু, তা আমরা বুঝতে চাই। কারণ আমরা যে মশা নিয়ে গবেষণা করেছি, তার প্রতিটিই রোগ ছড়াতে পটু। ডেঙ্গু, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস এবং পীত জ্বরের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়ায় এই মশাগুলো। মশার আকর্ষণ সৃষ্টিকারী অণু ও ব্যাকটেরিয়াগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর এবং নতুন ধরনের কমার্শিয়াল রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর উপায় আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।’
মশারা মূলত দৃষ্টিশক্তি, শরীরের তাপমাত্রা এবং গন্ধের ওপর ভিত্তি করে তাদের শিকার খুঁজে নেয়। কিন্তু মানবদেহের গন্ধ এক হাজারের বেশি রাসায়নিকের এক জটিল মিশ্রণ, যার অনেকটাই তৈরি হয় আমাদের ত্বকে বাস করা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে। কোন নির্দিষ্ট গন্ধ বা সংকেতের ওপর ভিত্তি করে মশা তার পছন্দের মানুষটিকে বেছে নেয়, তা নির্ধারণ করা তাই বেশ কঠিন ছিল।
এই রহস্য উন্মোচনে গবেষক দল ১১৯ জন স্বেচ্ছাসবককে একত্র করেন এবং তিনটি ভিন্ন প্রজাতির মশাকে তাদের গন্ধ পরীক্ষা করার সুযোগ দেন। দিনের বেলায় সক্রিয় ‘এডিস এজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস’-এর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকরা একটি নির্দিষ্ট ডিভাইসে তাদের হাত রাখেন, যেখানে মশা গন্ধ পেলেও কামড়াতে পারত না। অন্যদিকে, রাতের বেলা সক্রিয় ‘কিউলেক্স কুইনকুইফাসিয়াটাস’-এর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকরা দীর্ঘ সময় নাইলনের হাতঘেরা কাপড় পরে তাদের গন্ধ সংগ্রহ করেন, যা পরে গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি মশার প্রজাতিই আলাদা দলের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল। এমনকি ‘এডিস এজিপ্টি’ মশার নারী-পুরুষের মধ্যে পুরুষদের প্রতি সামান্য হলেও বেশি আকর্ষণ দেখা গেছে। যদিও কিছু মানুষের প্রতি একাধিক প্রজাতির মশা আকৃষ্ট হয়েছিল। তবে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি তিনটি প্রজাতিকেই সমান তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছেন।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ‘এডিস এজিপ্টি ও কিউলেক্স’ প্রজাতির মশারা মূলত এমন মানুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, যাদের শরীরের ত্বকের নিজস্ব গন্ধ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, ‘এডিস অ্যালবোপিক্টাস’ প্রজাতিটি গাছের মতো গন্ধযুক্ত ১৩টি রাসায়নিক যৌগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এ ছাড়া উচ্চ আকর্ষণের শিকার হওয়া দলগুলোর সবার ত্বকেই কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মানবদেহের গন্ধ জটিল হওয়ায় এর সব উপাদান চিহ্নিত করা কঠিন। তবে গবেষকদের মতে, মশার এই ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ প্রমাণ করে যে প্রতিটি প্রজাতি নিজস্ব উপায়ে হোস্ট বা শিকার খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করেছে।
ভবিষ্যতে গবেষকরা জানতে চান, ত্বকের ব্যাকটেরিয়াগুলো কীভাবে এই সুবাস বা দুর্গন্ধ তৈরি করে, যা মশাকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে। এই গবেষণার সফল প্রয়োগের মাধ্যমে এমন সব জীবাণুভিত্তিক রিপেলেন্ট বা ফাঁদ তৈরি সম্ভব হবে, যা নির্দিষ্ট এলাকার সবচেয়ে ক্ষতিকর মশাগুলো দমন করতে সাহায্য করবে। গবেষকদের মূল লক্ষ্য একটাই— মানুষকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করা আর মশার কামড়ের কারণ খুঁজে বের করাই তার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।





