ল্যাবে তৈরি 'ব্ল্যাক হোলের' সিম্যুলেশন, অতঃপর

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটির তৈরি
মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং চরম আকর্ষণের বস্তু হলো ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। এর মহাকর্ষীয় টান এতটাই শক্তিশালী যে এর নির্দিষ্ট সীমানা বা ইভেন্ট হরাইজনের ভেতর থেকে কোনো কিছুই, এমনকি আলোও কখনো পালিয়ে আসতে পারে না।
তবে ১৯৭০-এর দশকে বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব দেন, যা বিজ্ঞানীদের চেনা ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়। হকিং দাবি করেন, কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে ব্ল্যাক হোলগুলো সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়, বরং তারা প্রতিনিয়ত এক ধরণের তাপীয় বিকিরণ তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে মহাবিশ্বে বিলীন হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হকিং রেডিয়েশন’।
কিন্তু মহাবিশ্বের আসল ব্ল্যাক হোলগুলো আমাদের থেকে এত দূরে যে সেখান থেকে নির্গত হওয়া এই অত্যন্ত ক্ষীণ বিকিরণ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা বর্তমান প্রযুক্তিতে অসম্ভব। তার চেয়েও বড় ধাঁধা ছিল, বিকিরণ ছড়ানোর সময় ব্ল্যাক হোলটি ঠিক কীভাবে নিজের শক্তি হারিয়ে ফেলে—পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ব্যাকরিঅ্যাকশন’। দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে অধরা থাকা সেই জটিল রহস্যেরই এক অভূতপূর্ব সমাধান এবার মিলেছে পৃথিবীর বুকেই, ল্যাবরেটরির কৃত্রিম সিম্যুলেশনে।
জার্মানির প্যাডারবর্ন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ লরেঞ্জো প্রোকোপিওর নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক ল্যাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি এক আলো ও অপটিক্যাল ফাইবারের ব্ল্যাক হোলে হকিং বিকিরণের সেই ব্যাকরিঅ্যাকশন বা শক্তির ক্ষয় প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
মহাকাশের আসল ব্ল্যাক হোলে পরীক্ষা চালানো সম্ভব নয় বলে গবেষকেরা এক দশক আগে তৈরি হওয়া একটি সৃজনশীল পদ্ধতি বেছে নেন। তারা একটি বিশেষ অপটিক্যাল ফাইবারের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত তীব্র ও দ্রুতগতির লেজার পালস পাঠান।
এখানে প্রথম লেজার পালসটি ফাইবারের ভেতরের আলোকধর্মকে এমনভাবে পরিবর্তন করে, যা দ্বিতীয় লেজার পালসটির জন্য একটি কৃত্রিম ব্ল্যাক হোলের সীমানা বা ইভেন্ট হরাইজন তৈরি করে।
বিজ্ঞানীরা মূলত নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের মতো একটি ঘটনা লক্ষ্য করার চেষ্টা করছিলেন। আমরা জানি, চাকাযুক্ত স্কেটিং জুতো পরে কাউকে ধাক্কা দিলে অপর ব্যক্তি যেমন সামনে এগিয়ে যায়, তেমনি ধাক্কা দেওয়া ব্যক্তিটিও সমপরিমাণ শক্তিতে পেছনে হটে আসে।
ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রেও যখন হকিং রেডিয়েশন শক্তি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, তখন মূল ব্ল্যাক হোলটি যে সমপরিমাণ শক্তি হারাবে—বিজ্ঞানীরা এবার সেই শক্তির সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা ‘পেছনে হটে আসার’ ধাক্কাটি লেজার পালসের ভেতরে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছেন।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল এর সরলতা।
এতকাল বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন যে, কৃত্রিম ব্ল্যাক হোলে এই হকিং বিকিরণটি হয়তো আলোর অনেকগুলো জটিল ও বহুমুখী মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। কিন্তু এই নতুন গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করেছে যে এটি আসলে অত্যন্ত সহজ এবং সরাসরি একটি প্রক্রিয়া।
গবেষকদের মতে, মহাকাশের আসল ব্ল্যাক হোলগুলোও হয়তো এই রকম অতি সাধারণ ও সরাসরি উপায়েই মহাবিশ্বে শক্তি বিকিরণ করছে এবং বাষ্পীভূত হচ্ছে। এই সাফল্য তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার জটিল সমীকরণগুলোকে অনেক সহজ করে তুলবে এবং মহাকর্ষের প্রেক্ষাপটে হকিং রেডিয়েশনের সৃষ্টি রহস্যের ওপর নতুন আলো ফেলবে।
এমনকি এটি স্টিফেন হকিংয়ের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাড়া করে ফেরা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান জটিলতা ‘ইনফরমেশন প্যারাডক্স’ বা তথ্যগত ধাঁধার জট খুলতেও সাহায্য করতে পারে।
সুদূর মহাকাশের আসল ব্ল্যাক হোলে হয়তো এই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য মানুষের কোনোদিন হবে না, কিন্তু ল্যাবের এই আলোর তৈরি অনন্য প্রদর্শনীটি প্রমাণ করে দিল যে প্রকৃতির গভীরতম রহস্যগুলো বিজ্ঞানীদের হাত ধরে টেবিলের ওপরও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।




