ছাতা ধরা গাছ

ছবি এঁকেছেন রজত
গল্প লিখেছে মো. মিরসাব আবতাহী। সে থাকে চট্টগ্রামে। হালিশহর প্রি-ক্যাডেট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে তার রোল নং ২৭
সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে। এমন বৃষ্টি, যেন আকাশের কেউ কল বন্ধ করতে ভুলে গেছে। আমি বারান্দায় বসেছিলাম। মাঠে যাওয়া যাবে না। ফুটবল খেলাও বন্ধ। হঠাৎ দেখি, আমাদের উঠোনের আমগাছটার নিচে একটা হলুদ রঙের কুকুরছানা গুটিসুটি মেরে বসে আছে। পুরোপুরি ভিজে গেছে সে। আমি মাকে বললাম, ‘ওকে ঘরে নিয়ে আসি?’
মা জানালা দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘ওর মা নিশ্চয়ই আশপাশেই আছে। ভয় পাস না।’
কিন্তু কুকুরছানাটা কাঁপছিল। আমি চুপচাপ একটা পুরনো তোয়ালে নিয়ে বের হলাম। যেই না গাছটার কাছে গেলাম, অদ্ভুত একটা জিনিস খেয়াল করলাম। চারদিকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু গাছটার একেবারে নিচে মাটি তেমন ভেজেনি। পাতাগুলো এত ঘন হয়ে আছে যে, বৃষ্টির বেশিরভাগ জল আটকে দিচ্ছে। কুকুরছানাটা ঠিক সেই শুকনো জায়গাতেই বসে আছে। আমার মনে হলো, গাছটা যেন নিজের দুই হাত মেলে ওর ওপর ছাতা ধরে আছে।
আমি তোয়ালেটা কুকুরছানার পাশে রেখে একটু দূরে দাঁড়ালাম। সে প্রথমে ভয় পেল। তারপর ধীরে ধীরে তোয়ালের ওপর গোল হয়ে শুয়ে পড়ল। ঠিক তখনই একটা দোয়েল এসে ডালে বসল। গাছের ডাল বেয়ে নেমে এলো একটা কাঠবিড়ালি। দুটো শালিক ভেজা পাতায় লাফালাফি করতে লাগল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, বৃষ্টির দিনে এই গাছের নিচে শুধু কুকুরছানাই নয়, আরও কত প্রাণী আশ্রয় নিতে আসে! আমরা মানুষ তো শুধু আম খাই। কিন্তু গাছটা যে কতজনকে ঘর দেয়, সেটা আগে বুঝিনি।
বিকালের দিকে বৃষ্টি থামল। হঠাৎ দূর থেকে একটা বড় কুকুর দৌড়ে এলো। সে এসে কুকুরছানাটার গা শুঁকে দেখল। তারপর জিভ দিয়ে মুখ চেটে দিল। কুকুরছানাটা লেজ নাড়তে নাড়তে মায়ের পেছনে হাঁটতে লাগল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ওরা চলে গেল। আমগাছটা আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যেন কিছুই হয়নি।
সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরলে আমি সব খুলে বললাম। বাবা হেসে বললেন, ‘মানুষ বাড়ি বানায় ইট দিয়ে। আর গাছ বাড়ি বানায় ছায়া দিয়ে।’
রাতে ঘুমানোর আগে আমি জানালা দিয়ে আমগাছটার দিকে তাকালাম। বাতাসে পাতাগুলো নড়ছিল। আমার মনে হলো, গাছটা যেন আমাকে দেখে হাসছে। পরদিন সকালে আমি একটা ছোট্ট কাগজে লিখলাম, ‘ধন্যবাদ, আমগাছ।’
কাগজটা সুতা দিয়ে গাছের নিচের দিকের একটা ডালে বেঁধে দিলাম। কেউ পড়বে না, জানতাম। গাছও হয়তো পড়তে পারে না। তবু আমার মনে হচ্ছিল, ভালোবাসার সব কথার উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না। কিছু উত্তর ছায়া হয়েই সারা জীবন দাঁড়িয়ে থাকে।





