আপনজনের ছদ্মবেশে

আঁকা : সোহানুর রহমান
সব প্রতিবেশীই কি ভালো হন? চট্টগ্রামের বাসিন্দা এক ছোট্ট শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিবেশী এসেছিল মৃত্যুদূত হয়ে। লিখেছেন রমেন দাশগুপ্ত
নভেম্বরের হালকা শীতের বিকাল। সালটা ২০২২। চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার নয়ারহাট এলাকা। পাঁচ বছরের ফুটফুটে শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত চোখেমুখে রাজ্যের সবটুকু বিস্ময় নিয়ে আরবি পড়তে যাচ্ছিল বাড়ির পাশের মক্তবে। পরিচিত গলি, চেনা মানুষজন। কিন্তু কে জানত, এই চেনা মুখের ভিড়েই ওত পেতে আছে এক ভয়ংকর পিশাচ!
পিশাচটির নাম আবীর আলী। কোনো অচেনা আগন্তুক নয়। আয়াতদের বাড়িতে প্রায় ২১ বছর ধরে ভাড়ায় থাকা পরিবারের ছেলে। আয়াতের দাদা-দাদির কোলেই আবীরের বেড়ে ওঠা। ছোট্ট মেয়েটি তাকে চিনত আপন মানুষের মতোই। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই ঘাতকের মনে তৈরি হচ্ছিল এক নির্মম চিত্রনাট্য। টিভির পর্দায় ক্রাইম সিরিয়াল দেখে আবীরের মাথায় ঢুকেছিল মুক্তিপণ আদায়ের নীলনকশা।
অবশ্য আবীরের তখনকার ১৯ বছরের জীবনটাও নানা টানাপড়েনের। মা-বাবার সম্পর্ক নামেমাত্র। বাবা থাকতেন আয়াতদের বাসার ভাড়াটিয়া হিসেবে। মা আর একমাত্র বোন থাকতেন আরেক বাসায়। অবহেলার জীবনটি কাটছিল দুই বাসায় ঘুরে ঘুরে। জীবন নিয়ে চরম হতাশা। পড়ালেখাও হয়নি তেমন। আয়-উপার্জন অবলম্বন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। ভেবেছিল, আয়াতকে অপহরণ করে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ নিয়ে ঘোরাবে জীবনের চাকা। তা-ই হয়তো ডায়েরির পাতায় লিখেছিল, ‘আমার দরকার টাকাপয়সার, স্বপ্ন আমার বড়লোক হওয়ার।’
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর। আয়াতের মা সাহেদা আক্তার তামান্নার চোখের সামনে সন্ধ্যা নামল। কিন্তু বাড়ি ফেরেনি মেয়ে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে উদ্বেগের দীর্ঘ প্রহর। মক্তবসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়ে গেছে। কোথাও নেই ছোট্ট মেয়েটি। স্বজনদের বুক জুড়ে তখন অজানা আশঙ্কা। ছুটছেন এদিক-সেদিক। সঙ্গে ঘাতক আবীর আলীও। একটি শিশুকে ফিরে পাওয়ার আকুতি ছড়িয়ে পড়ল পাড়া-মহল্লায়। কিন্তু তামান্না তখনো জানতেন না, তার মেয়ের বস্তাবন্দি লাশ পড়ে আছে তার বাসার নিচেই ভাড়াটিয়ার ঘরে।
ইপিজেড থানায় করা হলো সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল নিখোঁজের পোস্টার। তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটিতে তখন একঝাঁক ‘তারকা’ কর্মকর্তা। ক্রাইম ডিটেকশনে যাদের খ্যাতি দেশ জুড়ে। ইলিয়াস খান, ইখতিয়ার উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, মর্জিনা আক্তার, মনোজ কুমার দে— দলবেঁধে শুরু করেন রুদ্ধশ্বাস অনুসন্ধান। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ। আয়াতের খেলার সাথিদের সঙ্গে ভাব জমানো। নানা সূত্রে পাওয়া একগুচ্ছ তথ্যের ফুলে ফুলে মালা গেঁথে তাদের সন্দেহের তালিকায় এলো প্রতিবেশী আবীর আলীর নাম।
শুরুতে কারও বিশ্বাস হয়নি। চেনা মানুষ, প্রতিবেশীর চেয়ে বেশি সম্পর্ক। অনেকটা ঘরের মানুষ। সেই আবীরই তৈরি করেছে তার কোলেপিঠে ঘুরে বেড়ানো আয়াতের মৃত্যুফাঁদ! আবীরকে আটক করে জেরার একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে সেই হাড়হিম করা ভয়াবহ সত্য। আয়াতদের যে বাসায় আবীরের বাবা ভাড়া থাকতেন, ১৪ নভেম্বর বিকালে গলি থেকে আয়াতকে কোলে নিয়ে সেই বাসায় ঢোকে আবীর। সেখানে শ্বাসরোধে হত্যা করে শিশুটিকে।
আকমল আলী রোডের নর্দমা থেকে শুরু করে সাগরতীর— সবখানেই খোঁজ চলে
হত্যার পর আয়াতের মরদেহ ছয় টুকরো করে ছয়টি প্যাকেটে ভরে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয় আবীর। ২৫ নভেম্বর আবীরকে নিয়ে লাশের সন্ধানে অভিযান শুরু করে পিবিআই। প্রথমে উদ্ধার হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বঁটি এবং তার বাসার পাশে কবরস্থান থেকে আয়াতের জুতা। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটি তখনো বাকি— শিশুটির দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া।
২৭ নভেম্বর ইপিজেড থানার আকমল আলী রোডের পকেটবাজার এলাকায় আবীরের মায়ের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যায় ব্যবহৃত কাটার। একই অভিযানে পাওয়া যায় একটি ডায়েরি। সেখানে আবীরের হাতে লেখা খুনের পরোক্ষ মোটিভ। তবে সমস্যা তৈরি হয় মৃতদেহের খণ্ডিত অংশগুলো খুঁজে পেতে। ৩০ নভেম্বর আকমল আলী ঘাটসংলগ্ন স্লুইসগেট এলাকার একটি গর্ত থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় উদ্ধার হয় আয়াতের দুই পা। পরদিন ১ ডিসেম্বর। কাছাকাছি এলাকা থেকেই পাওয়া যায় খণ্ডিত মাথা। দেহের বাকি অংশের সন্ধানে চলতে থাকে তল্লাশি। আকমল আলী রোডের নর্দমা থেকে শুরু করে সাগরতীর— সবখানেই খোঁজ চলে। আর কিছুই মেলেনি। সাগরপাড়ের বিভিন্ন জায়গার মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখার কারণে হয়তো জলের তোড়েই ভেসে যায় কোনো কোনো অংশ।
আবীরের বাসায় পাওয়া রক্তের নমুনার সঙ্গে আয়াতের ডিএনএর মিল পায় পিবিআই। আবীরকে অপরাধী প্রমাণ করার জন্য এর মাধ্যমে বড় সূত্র হাতে এলো। জেরার মুখে পিবিআইকে আবীর বলল, মুক্তিপণের টাকার জন্যই আয়াতকে খুনের পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা জানত তার এক কিশোর বয়সী বন্ধুও। আয়াতের বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি করার জন্য একটি মোবাইল ফোনও কিনেছিল। কিন্তু তার সংগ্রহে থাকা সিমটি সচল না থাকায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। যে অর্থের লোভে এমন নৃশংসতা, সেই অর্থের নাগাল পাওয়ার আগেই নিভে যায় একটি নিষ্পাপ প্রাণ।
তবে যে মুক্তিপণের জন্য এ অপহরণ, সেটি পাওয়ার সেরকম কোনো চেষ্টা না করেই কেন তাড়াহুড়া করে হত্যা করা হলো শিশুটিকে— তার উত্তর মেলেনি। অপরাধীও কি তা জানত?
আয়াতের বাবা সোহেল রানা ইপিজেড থানায় হত্যা মামলা করেন। পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে একমাত্র আসামি আবীর আলী। তবে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের পরিকল্পনা জেনেও গোপন রাখার অভিযোগে আবীরের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক সহযোগীর বিরুদ্ধে পৃথকভাবে দেওয়া হয় দোষীপত্র। আবীরের বিচার শেষ হলেও তার বিচার অবশ্য এখনো চলছে শিশু আদালতে।
২০২৬ সালের ১৭ জুন। চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ। পিনপতন নীরবতার মাঝে বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস পড়তে শুরু করলেন এক ঐতিহাসিক রায়। আসামির কাঠগড়ায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই আবীর আলী।
বিচারকের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো চরম সত্য, ‘যাদের কোলে মানুষ হয়েছে, তাদের সন্তানকেই সে হত্যা করেছে।’ আদালত এই হত্যাকাণ্ডকে ‘পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস ও নির্মম’ বলে আখ্যা দেন। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, এটি শুধু একজন নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা নয়; হত্যার পর মৃতদেহের ওপর চরম নির্যাতন, যা মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা এবং সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী।
অতঃপর শিশু আয়াতকে অপহরণ ও খুনের দায়ে আবীর আলীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত।



