দ্য পিয়েরে হোটেলে ডাকাতি

নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে তখন নতুন বছরের আমেজে ভাসছে। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি, ভোররাত। ঘড়ির কাঁটা সবেমাত্র ৪টার ঘর ছুঁয়েছে। বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, সেন্ট্রাল পার্কের চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। কিন্তু ফিফথ অ্যাভিনিউর অভিজাত ‘দ্য পিয়েরে’ হোটেলের ভেতরে তখন রচিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও নিখুঁত এক ডাকাতি।
সেদিন ভোরে হোটেলের লবিতে প্রবেশ করেছিল মার্জিত পোশাকে একদল মানুষ। তাদের পরনে দামি কোট আর চোখে চশমা। এই দলের মূল নেতা ছিলেন স্যামুয়েল নালো। তার সঙ্গে ছিলেন প্রফেশনাল চোর রবার্ট ‘ববি’ কমফোর্ট (যিনি রচেস্টার ক্রাইম ফ্যামিলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন) এবং ক্রিস্টি ‘দ্য টিক’ ফার্নারি (লুচেসি ক্রাইম ফ্যামিলির সহযোগী)। নিউ ইয়র্কের এই বিলাসবহুল হোটেলে দেশের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও সেলিব্রেটিরা নতুন বছর উদযাপন করতে এসে নিজেদের মহামূল্যবান হীরা-জহরত সেফটি ডিপোজিট বক্সে রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। ডাকাতদের কাছে খবর ছিল, এই বাক্সগুলোতে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
ভোর ৩টার দিকে আল গ্রিন নামের এক সহযোগী ড্রাইভারের ইউনিফর্ম পরে হোটেলের প্রবেশদ্বারে একটি কালো ক্যাডিলাক লিমুজিন গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়ায়। ভুয়া রিজার্ভেশনের নাম ভাঙিয়ে তারা ভেতরে ঢুকে রাতের সিকিউরিটি গার্ডকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে ফেলে। এরপর একে একে নাইটক্লার্ক, সুইচবোর্ড অপারেটর ও লিফটম্যান— সবাইকে বন্দি করা হয়। ধীরে ধীরে জিম্মির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৯-এ, যাদের তিন ডজন হাতকড়ার সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট অ্যালকোভে ফেলে রাখা হয়েছিল। ডাকাতরা হোটেলের কর্মীদের কাছ থেকে লকবক্সের চাবি ও ডিপোজিটকারীদের ইনডেক্স কার্ড সংগ্রহ করে। এরপর শুরু হয় আসল মিশন।
তারা হ্যারল্ড ইউরিস, টম ইয়াকি ও কলিওপ কুলুকুন্ডিসের মতো নামকরা শিল্পপতি ও বিত্তবানদের লকবক্সগুলো টার্গেট করে ভাঙতে শুরু করে। রবার্ট ‘ববি’ জারমেইন ও কমফোর্ট মিলে হোটেলের ২০৮টি সেফটি বক্সের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ফাঁকা করে ফেলেন। একে একে বেরিয়ে আসে চোখ ধাঁধানো হীরা, রত্নখচিত নেকলেস, সোনার গয়না, দামি ঘড়ি আর নগদ টাকা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে এই রুদ্ধশ্বাস লুণ্ঠন। তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী লুটের এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ডলার, যা আজকের দিনে প্রায় পৌনে তিন কোটি ডলারের সমান!
সকালের নতুন শিফট শুরু হওয়ার আগেই তারা নিরাপদে হাওয়া হয়ে যায়। পুলিশ খবর পাওয়ার পর হতবাক হয়ে যায়। এত বড় একটা ডাকাতি হয়ে গেল, অথচ কেউ একটা টুঁ শব্দও করল না! কিন্তু চোরদের কপাল মন্দ। লুটের মালের বাটোয়ারা নিয়ে লুচেসি ফ্যামিলির ফার্নারি ৩৩ শতাংশ দাবি করলে ক্ষুব্ধ নালো বেশিরভাগ মাল ডেট্রয়েটে পাঠিয়ে দেন। এরপর অবৈধ বুকমেকারদের কাছে ফেঁসে গিয়ে স্যামুয়েল নালো পুলিশের জালে গ্রেপ্তার হন। পুলিশ আসামিদের ধরলেও কোটি কোটি টাকার সেই হীরা-সোনা কখনোই পুরোপুরি উদ্ধার করা যায়নি।





