পুলিশের ডায়েরি
খুনটা কি তুই করেছিস

আঁকা : নওরিন জাহান শর্মী
কত ধরনের কেসই না সমাধান করতে হয় পুলিশ কর্মকর্তাদের। তার ঝুলি থেকে এমনই একটি খুনের রহস্য সমাধানের গল্প বলেছেন সৈকত রহিম
শরতের বিকাল। তবে রোদের তেজ আছে তখনো। চৌধুরানী বাজারের এক কোণে টং দোকানে বসে সবেমাত্র চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি, ঠিক তখনই পকেট থেকে বেজে উঠল ফোনটা।
অফিসার ইনচার্জ (ওসি) স্যারের কল। স্ক্রিনে আলো জ্বলতেই রিসিভ করলাম।
— কোথায় আছো তুমি? স্যারের গলায় তাড়া।
— স্যার, চৌধুরানী বাজারেই আছি।
— রাধাকৃষ্ণ গ্রামে একটা খুন হয়েছে। সময় নষ্ট না করে দ্রুত সেখানে যাও।
আমাদের গ্রাম পুলিশ আমিনুল লোকটা দারুণ চতুর। গোটা এলাকার হাঁড়ির খবর তার নখদর্পণে। তাকে ফোনে স্পটে আসতে বলেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দিলাম। অন্নদানগর থেকে দামুরচাকলা যাওয়ার পাকা রাস্তার একদম কোলঘেঁষে একটি নির্মাণাধীন আধাপাকা বাড়ি। সেখানে পৌঁছাতেই দেখি কৌতূহলী মানুষের জটলা। ঘরের দরজায় পা দিয়েই থমকে পড়লাম। লেপ-তোশক আর কাপড়ে মোড়া নিথর এক দেহ মেঝেতে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, বছর সত্তরের এক বৃদ্ধা। নাম জানানো হলো রাবেয়া বেগম। মাথার বাম পাশটা থেঁতলে গেছে, রক্ত জমাট বেঁধে কালচে রূপ নিয়েছে। অপরাধী অপরাধ ঢাকা দিতে কাপড় দিয়ে লাশটাকে ঢেকে রেখে চম্পট দিয়েছে।
তদন্তে নেমে শুরুতেই আমরা ধাঁধায় পড়ে গেলাম। একে তো একেবারে ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ড, তার ওপর বৃদ্ধার পরিবারের কেউ এখানে থাকে না। ছেলেমেয়েরা সবাই ঢাকায় চাকরি করে। তাদের মূল বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও রংপুরের পীরগাছার এই রাধাকৃষ্ণ গ্রামটি রাবেয়া বেগমের বাপের বাড়ি।
অপরাধীদের সম্ভাব্য তিনটি শ্রেণি বাছাই করলাম— ১. পারিবারিক বিরোধের জেরে আত্মীয়স্বজন, ২. এলাকার ছ্যাঁচড়া চোর বা ছিনতাইকারী, ৩. স্থানীয় মাদকসেবী।
তদন্ত এগোতে থাকলে জানা গেল, পরিবার বা আত্মীয়দের সঙ্গে বৃদ্ধার বা তার সন্তানদের কোনো বিরোধ ছিল না। অতএব, প্রথম সম্ভাবনাটি বাদ। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির লোকদের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করলাম। খুনের আগে-পরে কেউ ঘটনাস্থলের আশপাশে এসেছিল কি না? বৃদ্ধার বাসায় যাতায়াত করেছে কি না?
একে তো একেবারে ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ড, তার ওপর বৃদ্ধার পরিবারের কেউ এখানে থাকে না
তারপর সন্দেহভাজন কয়েকজনের মোবাইল নম্বর ট্র্যাকিংয়ে বসলাম। ট্র্যাকিং ডেটা পর্যালোচনা করতে গিয়ে অদ্ভুত একটা বিষয় চোখে পড়ল। দুটি সুনির্দিষ্ট নম্বরের মধ্যে শুধু টেক্সট মেসেজ আদান-প্রদান হচ্ছে। কোনো ভয়েস কল নেই বললেই চলে। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানলাম, নম্বর দুটি এক সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকার।
হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ২০২১ সালের ১৪ আগস্ট। দেখতে দেখতে এক মাস পেরিয়ে গেলেও জট খুলছিল না। সিনিয়র অফিসারদের চাপ বাড়ছিল; কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। একপর্যায়ে ওই দুটি নম্বরের টেক্সটের কনটেন্ট নিয়ে পড়লাম। মেসেজগুলো বিশ্লেষণ করতেই একটি খুদেবার্তায় চোখ আটকে গেল। প্রেমিকা তার প্রাক্তনকে লিখেছে—
‘খুনটা কি তুই করেছিস?’
এই প্রশ্নের উত্তর ছেলেটি টেক্সটে দেয়নি; সঙ্গে সঙ্গে কল করে মুখে বলেছে। আমার ‘সিক্সথ সেন্স’ জানান দিল, জট এখান থেকেই খুলবে। জানতে পারলাম, নম্বরটি ব্যবহার করে বৃদ্ধার বাড়িরই খুব কাছের এক ছেলে। নাম রুবেল ওরফে দুখু। তার রেকর্ড মোটেই ভালো নয়। মাদক সেবন, চুরি-ছিনতাই থেকে শুরু করে এলাকায় একবার একজনকে চাকু মারার ইতিহাসও আছে। লোকেশন ট্র্যাক করে দেখা গেল, ঘটনার পরপরই সে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। এখন আছে কক্সবাজারের টেকনাফে। ঘন ঘন জায়গা পাল্টাচ্ছে সে। সিনিয়র স্যারদের বিষয়টি জানাতেই দুখুকে গ্রেপ্তারের সবুজসংকেত পেয়ে গেলাম। কিন্তু দুখু এক জায়গায় স্থির হচ্ছিল না। অবশেষে গাজীপুরের নতুন বাজার এলাকায় গিয়ে তার লোকেশন স্থায়ী হলো। অভিযান চালাতে টিম নিয়ে গাজীপুর পৌঁছালাম। সেখান থেকেই আমরা ধরে ফেললাম দুখুকে।
টানা তিন দিনের রক্ত জল করা অভিযান শেষে আসামি নিয়ে ফিরলাম পীরগাছা থানায়।
জিজ্ঞাসাবাদে দুখু যা বলল, তা শুনে শিউরে উঠতে হয়। অপরাধের সঙ্গে আরও তিনজনের নামও বেরিয়ে এলো। বৃদ্ধার ছেলেমেয়েরা ঢাকায় থাকে। বাড়িতে নতুন পাকা ঘর তৈরির কাজ চলছিল। দুখু ও তার সহযোগীরা ভেবেছিল, ঘরে মোটা অঙ্কের টাকা আর গয়না আছে। সেই লোভে তারা সকালে চুরি করতে ঘরে ঢোকে। কিন্তু বৃদ্ধা তাদের চিনে ফেলেন। নিজেকে বাঁচাতে দুখু পাশ থেকে একটি ইট তুলে নিয়ে বৃদ্ধার মাথার পেছনে জোরে আঘাত করে। রাবেয়া বেগম তখনই মারা যান।
তবে তাদের ধারণা ভুল ছিল। আলমারি ও ঘর ওলটপালট করে তারা পেয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা! মাত্র এই সামান্য কটা টাকার লোভেই একটি নিরপরাধ জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল তারা। দুখুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই মুন্সীপাড়া এলাকা থেকে দুলাল মিয়া, মেহেদী হাসান রাঙ্গা ও শিমুল শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই রাঙ্গা হত্যাকাণ্ডের দিন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে লাইভ করেছিল। অপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছিল! পরে দুখু ও দুলাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
এর কিছুদিন পরই আমার বদলি হয়ে যায় ঢাকায়। তাই নিজ হাতে চার্জশিট জমা দিতে পারিনি। তবে পরে পীরগাছা থানা পুলিশ এই চারজনের নামেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটি এখন বিচারাধীন। সামান্য টেক্সটের সূত্র ধরে অবসান ঘটেছিল একটি কঠিন ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ডের।





