কিশোর গ্যাংয়ে কাঁপত ইংল্যান্ড

গত শতকের পঞ্চাশের দশকের ব্রিটিশ কিশোর গ্যাং ‘টেডি বয়েজ'। ছবি: লন্ডন মিউজিয়াম
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ে চিন্তিত দেশের মানুষ। আর ঠিক একই সমস্যায় শত বছর আগে আক্রান্ত ছিল লন্ডন ম্যানচেস্টারের সড়কগুলো। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
ইংল্যান্ডের শতবর্ষ আগের কোলাহলপূর্ণ গলিগুলোতে উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকটি ছিল এক চরম পরিবর্তনের সময়। একদিকে শিল্পবিপ্লবের অভূতপূর্ব বিকাশ ও আধুনিকায়নের ছোঁয়া; অন্যদিকে বড় বড় শিল্পাঞ্চল, কয়লাখনি ও বন্দরনগরীগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিগুলোতে ঘনীভূত হওয়া তীব্র দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সামাজিক বৈষম্য এক ভয়াবহ অস্থিতিশীল আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের জন্ম দিয়েছিল। এই রূঢ় ও নির্মম পরিবেশেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সে সময়ের সবচেয়ে আতঙ্কজনক এবং আলোচিত কিশোর ও যুব গ্যাং সংস্কৃতি, যা মূলত বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার ও লন্ডনের অলিগলিতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে।
সেকালের ভুক্তভোগী বস্তিগুলোতে মা-বাবারা যখন দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি ও বয়লারের পাশে হাড়ভাঙা খাটুনিতে ব্যস্ত থাকতেন, তখন অরক্ষিত ও অভিভাবকহীন কিশোর-তরুণরা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। সে যুগে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ ছিল না। ফলে এই অবহেলিত প্রজন্ম নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, বেঁচে থাকার তাগিদে এবং সমাজের কাছে নিজেদের শক্তির জানান দিতে দলবদ্ধ হতে শুরু করে। এভাবেই জন্ম নেয় বার্মিংহামের কুখ্যাত ‘পিকি ব্লায়েন্ডার্স’ এবং ম্যানচেস্টারের সুপরিচিত ‘স্কটলার্স’ গ্যাংয়ের মতো বহু দল।
অপরাধ জগতের এই অন্ধকারের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্যরা তাদের নিজস্ব স্টাইল ও ফ্যাশন সচেতনতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল, যা তাদের সাধারণ খেটে খাওয়া যুবকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখত। পিকি ব্লায়েন্ডার্সদের সদস্যরা সাধারণত সুনির্দিষ্ট টেইলর্ড জ্যাকেট, বোতামযুক্ত ওয়েস্টকোট, গলায় সিল্কের স্কার্ফ এবং সামনে বাঁকানো বিশেষ ধরনের ফ্ল্যাট ক্যাপ পরত। অন্যদিকে, ম্যানচেস্টারের স্কটলার্স কিশোররা চওড়া মোহরার বেল বটম ট্রাউজার্স, পয়েন্টেড ক্লগ জুতা এবং কপালে ঝুলিয়ে রাখা বিশেষ চুলের স্টাইল (‘ডঙ্কি ফ্রিঞ্জ’) রাখত। তাদের এই পরিপাটি অথচ ভীতিপ্রদ রূপ সে সময়ের সাধারণ মানুষের মনে যুগপৎ আতঙ্ক ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে এসব কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজ নিজ এলাকার নিয়ন্ত্রণ বা ‘টেরিটরি’ রক্ষা করা এবং আধিপত্য বিস্তার করা। ম্যানচেস্টার বা বার্মিংহামের বিভিন্ন পাড়া বা রাস্তার নামে গ্যাংগুলোর নামকরণ করা হতো, যেমন— অ্যানকয়েটসের ‘বেঙ্গল টাইগার্স’ কিংবা অ্যাঞ্জেল মেডোসের ‘মিডো ল্যাডস্’। সামান্য অজুহাতে বা অন্য এলাকার কিশোরদের সীমানা লঙ্ঘন করাকে কেন্দ্র করে শত শত তরুণ লাঠিসোঁটা, ছোরা, ভারী ধাতব বাকলযুক্ত চামড়ার বেল্ট এবং ইটপাটকেল নিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বা ‘স্কটলিং’-এ লিপ্ত হতো।
বার্মিংহামের পিকি ব্লায়েন্ডার্সদের মতো গ্যাংগুলো পরে আরও বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠে। তারা সাধারণ মারামারি ও ছোটখাটো ছিনতাই পেরিয়ে জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ঘোড়দৌড়ের বাজি ধরা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সুরক্ষা বা চাঁদা আদায়ের মতো সুসংগঠিত অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। পুলিশের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ বা ‘কনস্টেবল বেইটিং’-এর মতো ঘটনাও সে সময় ঘটেছিল।
তবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের দিকে এসে ব্রিটিশ সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজ সংস্কারকরা বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু কঠোর পুলিশি দমনপীড়ন বা জেল-জরিমানা দিয়ে এই গভীর সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর ফল হিসেবে শহরের অস্বাস্থ্যকর বস্তিগুলো পরিষ্কারকরণ অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি তরুণদের বিপথগামিতা রোধে বিভিন্ন যুব সংঘ, স্যালভেশন আর্মির কার্যক্রম, খেলাধুলার সুযোগ এবং আধুনিক বিনোদনের মাধ্যমগুলোর প্রসার ঘটানো হয়। উদাহরণ হিসেবে, ম্যানচেস্টারে যুবকদের অপরাধ থেকে সরিয়ে খেলায় মনোনিবেশ করানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ক্লাব ও সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, যা পরে বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব গঠনেও ভূমিকা রেখেছিল।
বলা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের এই কিশোর গ্যাংগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের প্রতীক ছিল না; বরং এগুলো ছিল দ্রুত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং চরম বৈষম্যমূলক ব্রিটিশ সমাজের এক অন্ধকার বাস্তবতার নিখাদ প্রতিচ্ছবি। অবহেলা ও সুযোগের অভাব কীভাবে একটি প্রজন্মের তরুণদের বিপথগামী করে তুলতে পারে, তার এই ঐতিহাসিক পাঠ আজও সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের গভীরভাবে ভাবায়।
সূত্র: গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ মিউজিয়াম



