এফবিআই ফাইলস
পার্কওয়েতে নরক

ভার্জিনিয়া রাজ্যের কলোনিয়াল পার্কওয়ে
ছুটির দিনে হাইওয়ে ধরে লং ড্রাইভে একান্তে সময় কাটাতে গিয়ে এক দম্পতি হলেন নিখোঁজ। পরে পাওয়া গেল মরদেহ। এমন ঘটনা ঘটল একের পর এক। লিখেছেন শুভ রহমান
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া রাজ্যের ঐতিহাসিক ও নৈসর্গিক কলোনিয়াল পার্কওয়ে একসময় হাজারো পর্যটক ও তরুণ যুগলদের জন্য ছিল খুবই জনপ্রিয় একটি স্থান। গাছপালায় ঘেরা, বাতিহীন ও নির্জন এই রাস্তা রোমান্টিক সময় কাটানোর জন্য পরিচিত হলেও ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে এটি পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ মানব শিকারের ভূমিতে। আমেরিকান অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও দীর্ঘ সময় অমীমাংসিত থাকা এই ট্র্যাজেডিটি ‘কলোনিয়াল পার্কওয়ে হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত।
১৯৮৬ সালের অক্টোবরে প্রথম এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ক্যাথলিন থমাস ও রেবেকা ডাউস্কি নামের দুই তরুণী। কলোনিয়াল পার্কওয়ের একটি নির্জন স্থানে তাদের গাড়ি থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী এই এলাকায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন বা খুন হন।
পদ্ধতিগত দিক থেকে প্রতিটি অপরাধের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল পাওয়া যেত। সাধারণত ছুটির রাতে তরুণ যুগলরা যখন তাদের গাড়িতে একান্ত সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন কোনো এক অজ্ঞাতপরিচয় শিকারি তাদের টার্গেট করত। পার্কওয়ের অন্ধকার ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে খুনি তাদের ওপর হামলা চালাত। কখনো গুলি করে, কখনো বা গলা টিপে বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অপরাধ সংঘটনের পর খুনি প্রায়ই নিহতদের গাড়িটি মূল ঘটনাস্থল থেকে দূরে অন্য কোথাও ড্রাইভ করে নিয়ে গিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে দিত। চার জোড়া তরুণ-তরুণী বা মোট আটজন মানুষ এই ধারাবাহিক সহিংসতার শিকার হন, যার মধ্যে কিছু জোড়ার মৃতদেহ পাওয়া গেলেও অনেকের ক্ষেত্রে আবার কোনো খোঁজ মেলেনি।
প্রমাণের অভাবে অপরাধী শনাক্ত না হওয়ায় মামলাটি একপর্যায়ে কোল্ড কেস হিসেবে ধামাচাপা পড়ে যায়
দশকের পর দশক ধরে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ভার্জিনিয়া স্টেট পুলিশ এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। শত শত সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তৎকালীন প্রযুক্তি এবং অস্পষ্ট প্রমাণের কারণে অপরাধীকে পাকড়াও করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে নিহতদের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। মামলাটি একপর্যায়ে কোল্ড কেস বা হিমাগারবন্দি ফাইল হিসেবে ধামাচাপা পড়তে বসেছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এই রহস্য হয়তো চিরকালই অন্ধকারের অন্তরালে থেকে যাবে।
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং আধুনিক ডিএনএ সায়েন্সের কল্যাণে বিগত বছরগুলোতে এই অমীমাংসিত মামলার পালে নতুন হাওয়া লাগে। ফরেনসিক বিজ্ঞান ও জিনোমিক প্রমাণের সুতায় টান দিয়ে গোয়েন্দারা অবশেষে বুঝতে পারেন, এই নৃশংসতাগুলোর পেছনে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাত রয়েছে। তদন্তে অ্যালান ওয়েড উইলমার সিনিয়র নামের এক স্থানীয় জেলে বা ফিশারম্যানের নাম জোরালোভাবে উঠে আসে।
কর্তৃপক্ষ ও ডিএনএ প্রমাণের বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে কলোনিয়াল পার্কওয়ের একাধিক কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। যদিও অপরাধ চিহ্নিত হওয়ার আগেই ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তি মারা গিয়েছিল, তবুও দীর্ঘ ৪০ বছর পর বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই জট খুলে যাওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে।
কলোনিয়াল পার্কওয়ে হত্যাকাণ্ড শুধু কয়েকটি খুনের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন, বিজ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতার দীর্ঘমেয়াদি সাধনা সত্যকে চিরতরে লুকিয়ে রাখতে দেয় না। তরুণ প্রাণের এমন আকস্মিক পতন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়েছে, যা সত্যিকারের অপরাধ বিজ্ঞানপ্রেমী ও গবেষকদের আজও শিহরিত করে।



