ঘরের শত্রু বিভীষণ

আঁকা : সোহানুর রহমান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহের আহমেদ। প্রতিহিংসার বলি হয়ে নিজের বিছানাতেই খুনের শিকার হন। লিখেছেন জেমাম আহমেদ
এক হিমেল রাত, রাজশাহী। নগরীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমপাড়া তখন ঘুমিয়ে ছিল গভীর নিস্তব্ধতায়। তবে সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সেখানকার একটি ছোট্ট দোতলা বাড়িতে ঘটেছিল ভয়ানক এক কাণ্ড। বাড়িটিতে একরকম একাই থাকতেন ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ। দেখাশোনা করতেন কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের জীবন যেমন হয়, তাহের স্যারের প্রতিদিনকার রুটিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। দিনে ছাত্রদের ক্লাস নেওয়া, রাতে একটু নিজের পড়াশোনা। সব ঠিকঠাকই চলছিল। তারপরই এলো সেই রাত। ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সকালে খোঁজ মিলল না তার। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বাসায়, আসেননি ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে। দিশাহারা ভঙ্গিতে কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীরও তার খোঁজখবর করছেন।
অধ্যাপকের বড় ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদের মনে সন্দেহ দানা বেঁধে ওঠে। হুট করে কাউকে কিছু না বলে বাবার গায়েব হওয়ার তো কথা নয়। বিলম্ব না করে সেদিনই মতিহার থানায় গিয়ে মামলা করলেন। আসামি অজ্ঞাতনামা। কেউ তখনো জানত না, কী ভয়ংকর সত্য অপেক্ষা করছে সামনে। দুদিন পরের কথা। ৩ ফেব্রুয়ারি। বাড়ির পেছনের একটি ম্যানহোল থেকে উদ্ধার হলো অধ্যাপকের নিথর দেহ। পুরো ক্যাম্পাস স্তব্ধ হয়ে গেল। শিক্ষার্থীরা জড়ো হলেন। সহকর্মী ও অন্যরা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটাই প্রশ্ন সবার মনে— কে করল এই কাজ? কেন করল?
গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ ছিল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। আর সেই জালিয়াতি ধরিয়ে দিয়েছিলেন খোদ তাহেরই
তদন্তের শুরুতেই পুলিশের সন্দেহ গেল কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলমের দিকে। তাকে আটক করা হলো। এরপর ঘটল এক চমকপ্রদ মোড়। নিহতের মোবাইল ফোন পাওয়া গেল জাহাঙ্গীরেরই বাসা থেকে। প্রমাণ সামনে আসতেই ভেঙে পড়লেন জাহাঙ্গীর। সব স্বীকার করলেন। বললেন, তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল পুরস্কারের; তার আর তার পরিবারের জন্য। কিন্তু কে দিয়েছিল সেই প্রতিশ্রুতি? অনুসন্ধান চালিয়ে পুলিশ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে ছিলেন তার নিজের বিভাগেরই শিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রনেতা মাহবুবুল আলম সালেহী। ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন আদালতে জবানবন্দি দেন। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে হত্যার আসল চিত্র।
মহিউদ্দিন ছিলেন অধ্যাপক তাহেরের নিজ বিভাগেরই সহকর্মী। সহযোগী অধ্যাপক। গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। আর সেই জালিয়াতি ধরিয়ে দিয়েছিলেন খোদ তাহেরই। ফলে আটকে গিয়েছিল মহিউদ্দিনের পদোন্নতি। ক্ষোভ জমেছিল বহুদিন ধরে। ধীরে ধীরে সেই ক্ষোভ রূপ নিল হিংসায়। আদালতের রায়ে পরে স্পষ্ট হয়েছিল একটি কথা। তাহের বেঁচে থাকলে মহিউদ্দিনের কখনোই অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ ছিল না। এ আশঙ্কাই তাকে ঠেলে দিল ভয়ংকর এক সিদ্ধান্তের দিকে। একা তিনি এই কাজ করেননি। যুক্ত করলেন আরও তিনজনকে। জাহাঙ্গীরের ভাই নাজমুল আলম ও তার শ্যালক আবদুস সালামও যুক্ত হলেন পরিকল্পনায়।
প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থের। এমনকি একটি কম্পিউটারও প্রলোভন হিসেবে ব্যবহার করলেন। লোভে রাজি হয়ে গেলেন তারা। রাতের অন্ধকারে ঢুকল খুনিরা। বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করা হলো নিরীহ শিক্ষককে। কোনো প্রতিরোধের সুযোগ পাননি। এরপর দেহ লুকিয়ে ফেলা হলো বাড়ির পেছনের ম্যানহোলে।
রাতের অন্ধকারে ঢুকল খুনিরা। বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করা হলো নিরীহ শিক্ষককে
খবরটা ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। ক্যাম্পাস জুড়ে নেমে এলো ক্ষোভ। ২০০৭ সালের ১৮ জুন ছয় আসামিকে নিয়ে শুরু হলো মামলার বিচার। সেদিনই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপপরিদর্শক আহসানুল কবির আদালতে জমা দেন অভিযোগপত্র। ২০০৮ সালে শিক্ষার্থী আর শিক্ষকরা রাস্তায় নামলেন; দাবি তুললেন দ্রুত বিচারের। সেই বছরের ২৩ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ টি এম মেসবাউদ্দৌলা রায় দিলেন। চারজনের মৃত্যুদণ্ড হলো— মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম, নাজমুল আলম ও আব্দুস সালাম। খালাস পেলেন দুজন— ছাত্রনেতা সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সি।
কিন্তু বিচারের পথ এখানেই শেষ হয়নি। শুরু হলো এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর যাত্রা। ডেথ রেফারেন্স গেল হাইকোর্টে। আসামিরা করলেন আপিল। বছরের পর বছর গড়িয়ে গেল। ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল হাইকোর্ট মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেন। তবু থামল না লড়াই। আরও এক দশক অপেক্ষা করতে হলো পরিবারকে। অবশেষে ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল এলো চূড়ান্ত রায়। প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সিলমোহর দিল সেই সাজায়। প্রাণভিক্ষার শেষ আবেদনও নাকচ হলো। জেল কোড অনুযায়ী চিঠি হাতে পাওয়ার ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করার নিয়ম ছিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নিজাম উদ্দিন সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন। সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিলও দিলেন একই তথ্য। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১০টা ১ মিনিট। মহিউদ্দিন আর জাহাঙ্গীর আলমের ফাঁসি কার্যকর হলো। সতেরো বছরের অপেক্ষার নিঃশব্দ সমাপ্তি। ফাঁসির আগে মহিউদ্দিন কথা বললেন স্ত্রীর সঙ্গে। বললেন, দেশ ছেড়ে চলে যেতে। বললেন, সন্তানদের নিয়ে বিদেশে থিতু হতে।
কিন্তু এই দীর্ঘ লড়াইয়ে অন্য এক মানুষ ছিলেন অবিচল। তাহেরের মেয়ে শেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ। শিক্ষক বাবা মেয়েকে ভর্তি করেছিলেন আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য; কিন্তু পিতার হত্যার দাবিতে তাকেই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, তা হয়তো কোনোদিন কল্পনাতেও আনেননি। বাবাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে শুধু বাবার হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার পেতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন একজন আইনজীবী হিসেবে। প্রতিটি শুনানিতে হাজির থেকে লড়ে গেছেন আদালতে। বছরের পর বছর ধরে হাল ছাড়েননি। তার এই সংকল্প হয়ে উঠেছে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
পদোন্নতির উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা আর ঈর্ষার বিষই যে একদিন রূপ নিতে পারে রক্তক্ষয়ী পরিণতিতে, অধ্যাপক তাহের হত্যাকাণ্ড তারই এক নির্মম দলিল হয়ে রইল।






