অভিশপ্ত রেলস্টেশন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দূর পাহাড়ের গায়ে বরফের মুকুট পরা কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী ছায়া যখন গড়িয়ে পড়ে বাংলার সীমান্ত ছাড়িয়ে ছোটনাগপুর মালভূমির লাল মাটির ওপর, তখন প্রকৃতির রূপ পাল্টে যায় পলকে। শীতের দিনে সেই দূরের তুষারশুভ্র শৃঙ্গের শীতল পরশ এসে মেশে পুরুলিয়ার রুক্ষ বাতাসে। আর ঠিক তখনই রাত নামলে মানভূমের কোটশিলা-মুড়ির এই দুর্গম প্রান্তরে নেমে আসে এক গা শিউরে ওঠা নিস্তব্ধতা।
রাত প্রায় সাড়ে ৮টা। কোটশিলা-মুড়ি সেকশনের রেললাইনটা তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক। ঠিক তখনই রেললাইনের ওপর দূর থেকে দেখা গেল এক অদ্ভুত আলো। সাদা একটা অবয়ব, যেন শাড়ি পরা কোনো নারী ধীর পায়ে রেললাইনের ওপর হেঁটে চলেছে। ট্রেনের চালক দূর থেকেই ব্রেক কষলেন, কিন্তু ততক্ষণে গা ছমছমে এক ঠান্ডায় জমে গেছে পুরো কেবিন। তারপর আর সামনে রেললাইনের ওপর কাউকে দেখতে পেলেন না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলার মানভূম অঞ্চলের এই কোটশিলা রেলওয়ে ডিভিশনেই লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর ইতিহাস। বলছিলাম বেগুড়কোদর রেলওয়ে স্টেশনের কথা, যে স্টেশনটি টানা ৪২ বছর ধরে মানুষের ভয়ের কারণে একেবারে পরিত্যক্ত পড়ে ছিল। ষাটের দশকের শুরুতে সাঁওতাল রানী লাচন কুমারীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চালু হয়েছিল বেগুড়কোদর স্টেশন। আনন্দ উপচে পড়েছিল স্থানীয় মানুষের মনে। স্বাধীনতার পর এই ছোট্ট জনপদের মানুষ ভেবেছিল, ট্রেন চালুর ফলে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে, ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি দীর্ঘকাল।
১৯৬৭ সালের এক শীতের রাতে স্টেশনের তৎকালীন স্টেশন মাস্টার রাতের ডিউটিতে ছিলেন। হঠাৎ প্ল্যাটফর্মের বাইরে রেললাইনের ধারে তার চোখ আটকে যায়। কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে তিনি দেখতে পান, সাদা শাড়ি পরা এক নারী চুল খোলা অবস্থায় রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো সাধারণ পথচারী। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই সাদা অবয়ব যেভাবে মিলিয়ে গেল, তাতে রক্ত হিম হয়ে আসে তার। পরের দিন সকালে স্টেশনের বাইরে স্থানীয়দের কাছে সেই কথা বলতেই কানাকানি শুরু হয়ে যায়। এর কিছুদিন পরই রটে যায় এক ভয়ংকর লোককথা— রেললাইনের ধারে আত্মঘাতী হওয়া এক তরুণীর আত্মা নাকি রূপ বদলে এই চত্বরে ঘুরে বেড়ায়। গুঞ্জনের রেশ কাটতে না কাটতেই এক সকালে স্থানীয় মানুষ ও রেলকর্মীরা দেখতে পান, স্টেশনের কোয়ার্টারে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন সেই স্টেশন মাস্টার ও তার পুরো পরিবার। ময়নাতদন্ত বা পুলিশের খাতায় কারণ যা-ই থাকুক না কেন, গ্রামবাসীর মনে গেঁথে যায় একটাই বিশ্বাস— ওই সাদা শাড়ির অশরীরী শক্তিই তাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকেই বেগুড়কোদর স্টেশনে নেমে আসে এক গভীর অভিশাপ। কোনো রেলকর্মী আর ওই স্টেশনে ডিউটি করতে রাজি হননি। একের পর এক স্টাফ ট্রান্সফারের অর্ডার দেওয়া হলেও কেউ সেখানে পা রাখেনি। রাতের বেলা ট্রেনগুলো ওই স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই লোকো পাইলট বা ড্রাইভাররা আতঙ্কিত হয়ে স্পিড বাড়িয়ে দিতেন। স্টেশনের নাম শুনলেই যাত্রীদের বুক কেঁপে উঠত। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রেলওয়ে বিভাগ এই স্টেশনকে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। দিনের আলোতেও যেখানে মানুষের পা পড়ত না, রাতের বেলায় সেই বেগুড়কোদর হয়ে উঠল সাক্ষাৎ প্রেতপুরী। স্থানীয়রা বলতেন, সন্ধ্যার পর নাকি ওই প্ল্যাটফর্মে টিকটিকির শব্দ বা মানুষের কান্নার আওয়াজ শোনা যেত। অনেকে দাবি করতেন, চলন্ত ট্রেন যখন এই স্টেশনের ওপর দিয়ে অতিক্রম করত, তখন ট্রেনের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত। যাত্রীরা জানালা-দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকতেন।
রেলের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেল একসময়ের জমজমাট একটি স্টেশন। চারপাশের মানুষ সন্ধ্যার পর এই স্টেশনের দিকে তাকাতেও ভয় পেত। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি তুলতে শুরু করলেন, এই অভিশাপের চাদর ভেদ করে স্টেশনটি আবার চালু করা হোক। তাদের নাছোড়বান্দা দাবির মুখে নড়েচড়ে বসল ভারতীয় রেল। অবশেষে ২০০৯ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদিচ্ছায় দীর্ঘ ৪২ বছরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবার চালু হয় বেগুড়কোদর স্টেশন।
নতুন করে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়, ট্রেন দাঁড়াতে শুরু করে। তবে স্টেশনটি পুনরায় চালু হলেও এর গাঁয়ে সেঁটে থাকা ‘ভুতুড়ে’ তকমা সহজে দূর হয়নি। বরং এর ফলে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়— ‘ভূত পর্যটন’ বা ঘোস্ট ট্যুরিজম।



