ভিন দেশের ভূত
লুইজিয়ানার অতৃপ্ত প্রেতাত্মা

লুইজিয়ানার ভ্যাপসা গরমে চরাচর যেন থমকে আছে। তবে ওক গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া সোনাঝরা রোদের আলোয় দ্য মাইর্টলস প্ল্যান্টেশনের বিশালাকার বারান্দাটাকে চিলতে রূপকথার মতো দেখায়— যতক্ষণ না আপনি এর দরজায় কড়া নাড়ছেন। ১৭৯৬ সালে জেনারেল ডেভিড ব্র্যাডফোর্ড নির্মিত এই বাড়ি বাইরে থেকে যতটাই নান্দনিক, ভেতরে এর ইতিহাস ঠিক ততটাই রক্তের কালিতে লেখা। স্থানীয়রা একে আমেরিকার সবচেয়ে ভৌতিক বাড়িগুলোর একটি বলে জানে।
১৭৯৬ সাল। লুইজিয়ানার সেন্ট ফ্রান্সিসভিলে ওক পাতার ঘেরাটোপে জন্ম নিয়েছিল এক গ্রামীণ জাঁকজমক। জেনারেল ব্র্যাডফোর্ড যখন এখানে পরিবার নিয়ে এলেন, তখন কে জানত এই মাটি একদিন এক অভিশপ্ত নাট্যমঞ্চ হয়ে উঠবে? ১৯ শতকের শুরুর দিকে ব্র্যাডফোর্ড পরিবারের এক দুঃখজনক মৃত্যুর পর বাড়িটি চলে যায় সারাহ ও ক্লার্ক উডরাফ দম্পতির হাতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; হলুদ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাদের তিন সন্তান। এরপরই শুরু হয় মাইর্টলসের ইতিহাসের সবচেয়ে লোমহর্ষক এবং অন্ধকার অধ্যায়।
গল্পটা এক দাসির। নাম ক্লোয়ি। মনিব ক্লার্ক উড্রাফের ওপর তার ক্ষোভ ছিল কি না, তা নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে কানাকানি শোনা যায়, ক্লার্কের গোপন নজর এড়াতে ক্লোয়ি নাকি প্রায়ই কান পাততেন গৃহকর্তার দরজায়। একদিন ধরা পড়ে যান তিনি। শাস্তিস্বরূপ ক্লার্ক তার একটি কান কেটে নেন। অপমানে আর প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে ক্লোয়ি তখন এক ভয়ানক পথ বেছে নেন। তিনি বাগানের বিষাক্ত ওয়াননাট পাতার নির্যাস মিশিয়ে দেন জন্মদিনের বিশেষ কেকের সঙ্গে। পরিকল্পনা ছিল, শুধু পরিবারের সবাইকে সামান্য অসুস্থ করে নিজের অনুগত প্রমাণ করা। কিন্তু কেকটি খেয়ে খোদ গৃহকর্ত্রী সারাহ ও দুই মেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
পরের পরিণতি ছিল আরও বিভীষিকাময়। ক্ষুব্ধ বাগান মালিক ও সহকর্মীরা ক্লোয়িকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং তার মৃতদেহ জলাভূমির জলে ফেলে দেয়। বিশ্বাস করা হয়, সেই অভিশপ্ত রাতের পর থেকেই ক্লোয়ির আত্মা এই বাড়ির প্রতিটি কাঠের ফ্লোরবোর্ডে ঘুরে বেড়ায়। পরনে তার সেই চেনা সবুজ পাগড়ি, চোখে প্রতিশোধের আগুন। পর্যটকরা আজও দাবি করেন, রাতের বেলায় ঘুমন্ত অতিথিদের কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে— ‘সব শেষ...।’
তবে মাইর্টলস প্ল্যান্টেশনের ভৌতিক ইতিহাস শুধু ক্লোয়ির গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; ১৯২৭ সালে এই ভূসম্পত্তির নতুন মালিক উইলিয়াম উড্রাফের ওপর নেমে আসে আরেক মর্মান্তিক অভিশাপ। খোদ ঘরের বারান্দায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বলা হয়ে থাকে, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মৃত্যুর আগে তিনি কোনোমতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসেন এবং ১৭ নম্বর সিঁড়ির ধাপে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজও নাকি পরিষ্কার দিনের আলোতে সেই ১৭ নম্বর সিঁড়িতে রক্ত ও জুতার দাগ ফুটে ওঠে! যত মোছাই হোক না কেন, পরদিন সকালে সেই দাগ ঠিক আগের জায়গাতেই ফিরে আসে— অমোচনীয় ও জীবন্ত।
ঘরের প্রতিটি পুরনো আয়না যেন অতীতের কোনো গোপন সাক্ষী। লুইজিয়ানার আইন অনুযায়ী মাইর্টলসের পুরনো আয়নাগুলো বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি, যাতে আলো প্রতিফলিত হলেও ঘরের ভেতরের দৃশ্য নাকি আটকে থাকে কাচের ওপারে। বহু পর্যটক রাতের বেলায় এই আয়নাগুলোতে নিজেদের চেহারার বাইরেও অন্য কোনো ছায়া বা রহস্যময় হাতের ছাপ দেখতে পেয়েছেন। এক দম্পতি একবার ছবি তুলেছিলেন এই ড্রয়িংরুমে। ছবি প্রিন্ট হওয়ার পর দেখা গেল, তাদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কঙ্কালসার এক নারী, গায়ে সেই ঐতিহাসিক যুগের গাউন!
সন্ধ্যা নামলেই দ্য মাইর্টলস প্ল্যান্টেশনের চারপাশের ওক গাছগুলো যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। বাতাস যখন ডালপালা নাড়িয়ে যায়, তখন মনে হয় কেউ যেন ফিসফিস করে কথা বলছে পুরনো কোনো ভাষায়। এই বাড়িতে আজ বহু ভূত শিকারি বা ঘোস্ট হান্টার ও গবেষক আসেন। তাদের ডিজিটাল রেকর্ডারে ধরা পড়ে অদ্ভুত সব শব্দ— অশরীরী কান্নার রোল, শিশুদের হাসাহাসি কিংবা কাঠের মেঝেতে ভারী জুতার খটখট শব্দ। কেউ বিশ্বাস করেন এটি নিছক মনস্তাত্ত্বিক ভ্রম, আবার কেউ চোখের সামনে দেখে কেঁপে ওঠেন বাস্তবতার নির্মম সত্যতা।



