ঋত্বিক ঘটকের বউ

১৯৫৫ সালের বৈশাখ মাস এলো পৃথিবীতে। দুজন স্থির করলেন বিয়ে করবেন। পলকেই চার হাত এক হয়ে গেল
একুশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পেছনের পৃষ্ঠা ওল্টাতে গিয়ে সুরমা ঘটক লিখেছেন, ‘একটা ভিড়ের দৃশ্যে সমীরণ দত্তের অনুরোধে একটুখানি অভিনয় করে দিয়ে আসি। রোগা, লম্বা চেহারার মানুষটি আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে আসেন।’ সেই সামান্য একটু দেখা থেকেই রোগা আর লম্বা মানুষ ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার শুরু। শিলং পাহাড়ের বাসিন্দা মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন এক অস্থির প্রাণ মানুষ ঋত্বিক ঘটক।
সুরমা পাহাড় থেকে এসে কলকাতায় পা রেখেছিলেন এমএ পড়ার জন্য। থাকতেন মামার বাড়িতে। ঘটনাচক্রে তাকেই পড়ানোর দায়িত্ব পেলেন ঋত্বিক ঘটক। পড়াতে গিয়ে কোনোদিন সুরমাকে উপহার দিতেন মার্কস, লেনিন আর প্লেখানভের বই। ‘বিসর্জন’ নাটকের মহড়া চলছে কলেজে। অপর্ণার চরিত্রে অভিনয় করবেন সুরমা। সেখানেও গিয়ে দেখতে পেলেন সেই রোগা, লম্বা মানুষটির ছায়া। তখন বসন্তকাল ছিল কি না, জানা যায় না। কিন্তু সুরমা নামের মেয়েটি প্রেমে পড়েছিলেন একরোখা আর খ্যাপাটে মানুষটির। ওই সময়ে সুরমা কখনো নিজেই চলে যেতেন ঋত্বিক ঘটকের কলকাতার ভাড়া বাড়িতে। সেখান থেকে বের হয়ে কলকাতা শহরের নানা পথ ধরে একসঙ্গে হাঁটতেন। ঋত্বিক তাকে গল্প শোনাতেন হাওর অঞ্চলের। স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টে বলতেন ময়মনসিংহ আর রাজশাহীর কথা। ওই সময়েই ভালোবাসার প্রথম নিবেদনে ঋত্বিক তাকে বলেছিলেন, ‘লক্ষ্মী, আমি তোমার জন্য সব করব।’
প্রথম প্রেমের চিঠিতে ঋত্বিক ঘটক লিখেছিলেন, ‘একটা মাসিক আয়ের সংস্থান করা প্রথম কর্তব্য। নইলে জীবনে স্নিগ্ধতা আসবে না।’ আবার কোনো চিঠিতে ছড়িয়ে পড়েছিল তার আত্মজিজ্ঞাসা, ‘আমাকে অ্যাট অল কোনো মেয়ের ভালো লাগে কী করে?’
১৯৫৫ সালের বৈশাখ মাস এলো পৃথিবীতে। দুজন স্থির করলেন বিয়ে করবেন। পলকেই চার হাত এক হয়ে গেল। ঠিক ওই সময়েই মুম্বাইয়ে চাকরি চূড়ান্ত হওয়ার খবর পান ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু ঝড়ের বাড়ির দরজায় যার ঠিকানা লেখা, তার কি দশটা-পাঁচটা চাকরি করা চলে? পরিচালক বিমল রায়ের ‘মধুমতী’ আর ঋষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘মুসাফির’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে লিখতেই স্ত্রীকে চিঠিতে জানালেন, দশটা-পাঁচটা অফিসে গিয়ে বসে থাকতে হবে... দাঁতে দাঁত চেপে শুধু পয়সার জন্য এখন চেষ্টা করা। দেখ লক্ষ্মী, এ জীবন আমাদের নয়। এসব ছেড়ে দেব... এ হবে না।
চাকরিটা আচমকা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ে টাকা জোগাড় করতে ‘পণ্ডিতমশাই’ সিনেমার জন্য একটানা সতেরো ঘণ্টা চিত্রনাট্য লিখে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
উত্তমকুমার থেকে শুরু করে অনেকেই সিনেমা বানানোর জন্য অর্থ সহায়তা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন বাড়িতে বসে রেকর্ডে একের পর এক গান শুনে চলেছেন ঋত্বিক ঘটক। কখনো আব্বাসউদ্দীন, কখনো শচীনকর্তা অথবা রবীন্দ্রসংগীত; সঙ্গে একনিষ্ঠ সহচর সুরা। কোনো কাজেই মনোযোগ নেই তার। অস্থির ভাবনার ঘূর্ণী মনের মধ্যে পাড় ভাঙছে শুধু।
‘রাস্তায় ঋত্বিক বাবু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। মুখে গোঁজা একটা টাকার নোট।’
উদ্ভ্রান্তভাবে ছুটে এসে দুই তরুণ তাকে খবরটা জানিয়েছিল। কলেজের শেষ ক্লাস সেদিন সুরমার। পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলেন স্বামীকে খুঁজতে।
১৯৬৯ সাল। ভারত সরকার ঋত্বিক ঘটককে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করল। মদ্যপানের মাত্রা বেড়ে গেল আরও। শেষ পর্যন্ত ঝড়ের সঙ্গে আর পেরে উঠলেন না সুরমা। ঘর ভাঙল। পথ আলাদা হয়ে গেল দুজনের। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি ভাঙন দুজনকে নিয়ে গেল শেষের পথে। একটি স্কুলে চাকরি নিয়ে সাঁইথিয়া চলে গেলেন সুরমা ঘটক। সঙ্গে তিন সন্তান।
দুজন মানুষের গল্প সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তখনো কিছুটা বাকি ছিল। মুম্বাই থেকে লেখা ঋত্বিক ঘটকের চিঠি পেলেন সুরমা। সেখানে লেখা, ‘আসছি। চার-পাঁচ দিন জ্বালাব। শান্তিনিকেতনেই থাকব। একবার করে এসে দেখে যাব। তারপর পালাব চিরকালের মতো। দেখি, পারি কি না।’
সত্যিই পালিয়ে গিয়েছিলেন। তার জন্য অপেক্ষা করেছিল মৃত্যু। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মারা যান বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রবাদপুরুষ।




