ইসমাইলের ছয় দশকের সংগ্রহশালা

মাদার তেরেসার বাঁধাই করা ছবি ও অটগ্রাফ হাতে সেলিম।
ছয় দশকের নিরলস চেষ্টায় টাঙ্গাইলের ইসমাইল হোসেন সেলিম গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। গল্প শুনিয়েছেন আবু জুবায়ের উজ্জ্বল
টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র তখন সেলিম। এক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ইব্রাহিম খাঁ। এক বড় ভাইয়ের অনুরোধে তার অটোগ্রাফ আনতে মঞ্চে উঠে যান সেলিম। ‘স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই? আমি বললাম, আপনার একটি অটোগ্রাফ। তিনি জানতে চাইলেন, কোন শ্রেণিতে পড়ি। বললাম, সপ্তম শ্রেণিতে। এরপর তিনি বললেন, তোমার বইয়ে আমার একটি গল্প আছে, পড়েছ? আমি বললাম, জি স্যার। তিনি সেই গল্প থেকে দুটি লাইন বলতে বললেন। আমি বলতে পারলে তিনি খাতায় শুধু স্বাক্ষরই করলেন না, আমার নামও লিখে দিলেন।’
এই ঘটনাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যিনি অটোগ্রাফ আনতে পাঠিয়ে ছিলেন, তিনি নিজের নাম না থাকায় কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হলেও সেলিমের মনে জন্ম নেয় নতুন এক আগ্রহ। তিনি উপলব্ধি করেন, অটোগ্রাফ সংগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীর গুণী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়।
এরপর থেকেই শুরু হয় বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ। তার সংগ্রহে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান, দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান, মানবতাবাদী মাদার তেরেসা, এভারেস্টজয়ী স্যার এডমন্ড হিলারি, চিত্রশিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনসহ আরও অনেক গুণী ব্যক্তির স্বাক্ষর।
তবে কিশোর বয়সে তার শখের শুরুটা এক সহপাঠীর হাতে ডাকটিকিটের অ্যালবাম দেখে। এরপর ডাকটিকিটে আগ্রহ কমে ধীরে ধীরে যোগ হতে থাকে পুরনো মুদ্রা, অটোগ্রাফ, টেলিফোনসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখন ইসমাইল হোসেন সেলিম সংগ্রহশালায় রয়েছে ১৭২টি দেশের ব্যাংক নোট, তিন শতাধিক পুরনো টেলিফোন, বিভিন্ন দেশের দুর্লভ মুদ্রা এবং বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ। এসব সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকারের ব্যাংক নোট, জিম্বাবুয়ের ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট, হংকংয়ের এক সেন্ট মূল্যমানের ব্যাংক নোট, চীনের ঝাউ রাজবংশের বেলচা ও ছুরি মুদ্রা, পশ্চিম আফ্রিকার ‘ম্যানিল্লা’ বা ব্রেসলেট মানি এবং বাংলার প্রাচীন কড়ি মুদ্রা।
১৯৯৩ সালে মাদার তেরেসার একটি অটোগ্রাফ সংগ্রহের জন্য কলকাতায় ছুটে যান সেলিম। গন্তব্য মিশনারিজ অব চ্যারিটির প্রধান কার্যালয়। প্রথম দিন সেখানে পৌঁছার পর জানানো হয়, মাদার তেরেসা ভারতীয়দের সঙ্গে দেখা করেন না। তখন তিনি জানান, তিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। পরিচয়পত্র দেখানোর পর কর্তৃপক্ষ পরদিন আসতে বলে।
পরদিন আবারও নির্ধারিত সময়ে সেখানে উপস্থিত হন। তাকে একটি হলে বসতে দেওয়া হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের অতিথিরাও অপেক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর পাশের কক্ষ থেকে মাদার তেরেসা বেরিয়ে এসে অতিথিদের সঙ্গে দেখা করেন। নিজের পালা এলে তিনি পরিচয় দেন এবং অটোগ্রাফের জন্য খাতা এগিয়ে দেন। মাদার তেরেসা স্বাক্ষর করে মৃদু হেসে তার দিকে তাকান, হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, তারপর ভেতরে চলে যান। সেলিমের ভাষায়, ‘ওই কয়েকটি মুহূর্ত আজও আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর একটি।’
অটোগ্রাফ সংগ্রহের পাশাপাশি সেলিমের আগ্রহ বাড়তে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহে। একসময় তার সংগ্রহশালা সমৃদ্ধ হতে থাকে এমন সব দুর্লভ মুদ্রা ও ব্যাংক নোটে, যেগুলো ইতিহাস আর সভ্যতারও সাক্ষী। তার সংগ্রহের অন্যতম জিম্বাবুয়ের ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাংক নোট। ২০০৮ সালে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির সময় দেশটি এই নোট চালু করেছিল। ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বেশি মূল্যমানের ব্যাংক নোট হিসেবে পরিচিত।
তার কাছে রয়েছে হংকংয়ের এক সেন্ট মূল্যমানের ব্যাংক নোটও। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রচলিত এই নোটকে বিশ্বের সর্বনিম্ন মূল্যমানের ব্যাংক নোটগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া রয়েছে ১৯১২ সালের রাশিয়ার তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকারের ব্যাংক নোট, যার দৈর্ঘ্য ১১ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৫ ইঞ্চি। ২০১৯ সালে এটি সংগ্রহ করেন সেলিম।
প্রাচীন মুদ্রার সংগ্রহও কম সমৃদ্ধ নয়। চীনের ঝাউ রাজবংশের খ্রিস্টপূর্ব ১০৪৬ থেকে ২৫৬ সাল পর্যন্ত প্রচলিত বেলচা (স্পেড) মুদ্রা, ৬০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ছুরি মুদ্রা, পশ্চিম আফ্রিকার ম্যানিল্লা বা ব্রেসলেট মানি এবং বাংলার একসময়ের বিনিময় মাধ্যম কড়ি মুদ্রা— সবই রয়েছে সংগ্রহে। কড়ির সেই প্রাচীন গণনাপদ্ধতিও তিনি সংরক্ষণ করেছেন— ৪ কড়ি সমান ১ গন্ডা, ৫ গন্ডায় ১ বড়ি, ৪ বড়িতে ১ পন, ১৬ পনে ১ কাহন এবং ১০ কাহনে ১ টাকা।
মুদ্রার পর সেলিমের নতুন নেশা হয়ে ওঠে পুরনো টেলিফোন সংগ্রহ। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া সেই যাত্রায় এখন তার সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে তিন শতাধিক টেলিফোন। ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন মডেলের টেলিফোনের মধ্যে রয়েছে ক্যান্ডেলস্টিক, রোটারি, মেরিন, মাইনিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেলিফোনসহ বিভিন্ন দেশের দুর্লভ সেট।
সেলিম বললেন, ‘একটি পুরনো টেলিফোন সংগ্রহের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জানতে হয় সেটির ইতিহাস, উৎপাদনের সময়কাল এবং কোথায় পাওয়া যেতে পারে। তাই প্রতিটি সংগ্রহের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অনুসন্ধান, ধৈর্য এবং অনেক শ্রম।’
টেলিফোন সংগ্রহ করতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ঘটনার কথাও শোনান সেলিম। একদিন খবর পেলেন, পুরনো আমলের একটি বিরল টেলিফোন বিক্রি হবে। বিক্রেতার পাঠানো ছবি দেখেই সেটি সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেন। দাম চাওয়া হলো ২ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু তখন তার পকেটে সংসারের জন্য চাল কেনার টাকাটিই শুধু ছিল।
সেলিম বললেন, ‘জানতাম, চাল না কিনলে পরিবারের সবাই কষ্টে পড়বে। তারপরও সেই টেলিফোনটি কিনে ফেলি। পরে বাড়িতে যা ঘটেছিল, তা আজও মনে পড়লে মন ভার হয়ে যায়।’
সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো তাকে আলোড়িত করে। তার ভাষায়, ‘কোনো দুর্লভ টেলিফোনের খবর পেলেই সেই দিনের কথা মনে পড়ে। সংগ্রহের নেশাই আমাকে বারবার টেনে নিয়ে যায়।’
বর্তমানে তার সংগ্রহশালায় রয়েছে তিন শতাধিক টেলিফোন। এগুলো সংগ্রহে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। অন্যান্য দুর্লভ সামগ্রী মিলিয়ে সংগ্রহের মূল্য ১০ লাখ টাকারও বেশি।
সংগ্রহ করা পুরনো টেলিফোন, মুদ্রা ও নানা সামগ্রী জায়গার অভাবে শোয়ার ঘরেই রাখতে হতো। এতে ঘর অগোছালো হয়ে যেত। অবশেষে বাধ্য হয়ে নিজের তিনতলা বাড়ির ছাদে একটি কক্ষ নির্মাণ করে সেখানে গড়ে তোলেন সংগ্রহশালা।
দীর্ঘ কয়েক দশকের শ্রমে গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালার ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি ভাবেন সেলিম। কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়েই বললেন, ‘এখানকার প্রতিটি জিনিস সংগ্রহ করতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু এগুলো সংরক্ষণ করার জন্য পরিবারের কাউকে আমি তৈরি করতে পারিনি। তাই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যদি সংগ্রহশালাটি সংরক্ষিত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের এই সম্পদ থেকে উপকৃত হবে।’
তিনি চান, এটি ব্যক্তি উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাক, যাতে আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বসভ্যতার নানা নিদর্শন কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়।







