৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস
প্রসব-পরবর্তী শারীরিক সুস্থতায় করণীয়

ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে
প্রসবের পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা— দুটি এক বিষয় নয়। লিখেছেন ফারজানা শারমিন
একটি শিশুর জন্ম মানেই একটি পরিবারের নতুন স্বপ্নের শুরু। ঘর ভরে যায় আনন্দে, ব্যস্ততায়, নতুন অতিথিকে ঘিরে অসংখ্য পরিকল্পনায়। কিন্তু এই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষটি— মা— প্রসবের পর কেমন আছেন, সেই প্রশ্নটি অনেক সময়ই হারিয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা— দুটি এক বিষয় নয়।
প্রসবের পর মা কি স্বাচ্ছন্দ্যে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন? শিশুকে কোলে নিতে পারছেন? দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন? সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারছেন? হাঁটতে গিয়ে ব্যথা বা ভারী অনুভূতি হচ্ছে কি? আগের মতো দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন কি?
এসব প্রশ্নের উত্তরও মায়ের সুস্থতার অংশ।
শরীরের ভেতরে বড় পরিবর্তন: গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরকে শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পেটের দেয়াল, মেরুদণ্ডের আশপাশের পেশি এবং শ্রোণীদেশের তলদেশীয় পেশিগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
বুকের খাঁচার নিচে থাকা মধ্যচ্ছদা, পেটের গভীর পেশি, মেরুদণ্ডের আশপাশের পেশি এবং শ্রোণীদেশের তলদেশীয় পেশিগুলো একসঙ্গে শরীরের মধ্যবর্তী অংশকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাঁটা, বসা থেকে ওঠা, শিশুকে কোলে নেওয়া, ভার তোলা— প্রতিদিনের প্রায় সব কাজেই এ ব্যবস্থার সমন্বিত কার্যক্ষমতা প্রয়োজন।
‘বাচ্চা হলে এমন একটু হবেই’— এ ধারণা বদলানো দরকার। একজন মা যদি বলেন—
‘বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।’ ‘হাঁটলে কোমরে ব্যথা হয়।’ ‘শিশুকে কোলে নিলে ব্যথা বাড়ে।’ ‘হাঁচি-কাশির সময় প্রস্রাব বের হয়ে যায়।’ ‘আগের মতো কাজ করতে পারছি না।’ তখন অনেক সময় আমরা খুব সহজেই বলে দিই—
‘বাচ্চা হলে এমন একটু হবেই। সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’ এই সহজ কথাটা হয়তো একজন মায়ের কষ্টকে আরও দীর্ঘ করে দিতে পারে।
কোমর ও শ্রোণীদেশের ব্যথা: প্রসবের পর কোমর বা শ্রোণীদেশে ব্যথা অনেক মায়ের জন্য পরিচিত অভিজ্ঞতা।
শিশুকে বারবার কোলে নেওয়া, দুধ খাওয়ানোর সময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা, ভুল দেহভঙ্গি, পেট ও শ্রোণীদেশের পেশির দুর্বলতা এবং দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা— এসব কারণে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসামূলক ব্যায়াম, পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন, নড়াচড়ার স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার প্রশিক্ষণ, সঠিক দেহভঙ্গি এবং দৈনন্দিন কাজের সময় শরীরের ওপর চাপ কমানোর কৌশল শেখানো যেতে পারে।
প্রসবের পর শরীরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তবে বিশ্রামের অর্থ দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা নয়
প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা: হাঁচি, কাশি, হাসি, দৌড়ানো কিংবা ভারী কিছু তোলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব বের হয়ে যেতে পারে। এটি শ্রোণীদেশের তলদেশীয় পেশির কার্যক্ষমতার সমস্যার একটি লক্ষণ হতে পারে।
এই পেশিগুলোর শক্তি, সহনশীলতা ও সমন্বয় মূল্যায়ন করে ব্যক্তিভেদে উপযুক্ত ব্যায়াম ও প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
পেটের মাঝখানে ফাঁক: গর্ভাবস্থায় পেটের দেয়ালের পেশি অতিরিক্ত প্রসারিত হওয়ার কারণে ডায়াস্টেসিস রেক্টি হতে পারে। এতে পেটের মাঝ বরাবর দুই পাশের পেশির মধ্যে ফাঁক বা মাঝখানে ফুলে ওঠার মতো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, গভীর মধ্যবর্তী পেশি সক্রিয় করার অনুশীলন, পেটের পেশির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজের উপযোগী ব্যায়ামের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা যেতে পারে।
শিশুকে মায়ের কাছে আনুন, মাকে শিশুর কাছে নয়: একজন মা দিনে বহুবার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান। প্রতিবার যদি তাকে সামনের দিকে ঝুঁকে, পিঠে যথাযথ ভর না দিয়ে কিংবা কাঁধ উঁচু করে বসতে হয়, তাহলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের ওপরের অংশে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই একটি সহজ নিয়ম মনে রাখা যায়—
‘শিশুকে মায়ের কাছে আনুন, মাকে শিশুর কাছে অতিরিক্ত ঝুঁকিয়ে দেবেন না।’
বিশ্রাম দরকার, কিন্তু দীর্ঘ সময় নয়: প্রসবের পর শরীরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তবে বিশ্রামের অর্থ দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে নিরাপদভাবে নড়াচড়া শুরু করা, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম শরীরকে স্বাভাবিক করে।
ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথার চিকিৎসা নয়: প্রসব-পরবর্তী পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা শুধু ব্যথা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট মায়ের শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন সমস্যাগুলো মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পেশির কার্যক্ষমতা, শরীরের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা, নড়াচড়ার ধরন, দেহভঙ্গি এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা উন্নত করার জন্য ব্যক্তিভিত্তিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।
লেখক: কনসালট্যান্ট
লেকচারার অব ফিজিওথেরাপি, বিএইচপিআই
সেন্টারে ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড





