রক্তস্বল্পতা মানেই আয়রনের ঘাটতি নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অ্যানিমিয়ার পেছনে আয়রনের ঘাটতি ছাড়াও আরও নানা কারণ থাকতে পারে। লিখেছেন ডা. ইসমত আরা ইসলাম
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া একটি খুব পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো— রক্তস্বল্পতা মানেই শরীরে আয়রনের ঘাটতি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। অ্যানিমিয়ার পেছনে আয়রনের ঘাটতি ছাড়াও আরও নানা কারণ থাকতে পারে, যা সঠিকভাবে নির্ণয় না করলে চিকিৎসা ব্যর্থ হতে পারে।
অ্যানিমিয়া কী?
অ্যানিমিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা প্রোটিন, যা শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে; ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়।
আয়রন ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া
আয়রন হলো হিমোগ্লোবিন তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে হিমোগ্লোবিন তৈরি ব্যাহত হয় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে অপুষ্টি, রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা ও শিশুদের দ্রুত বৃদ্ধি— এসব কারণে আয়রন ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া সব থেকে বেশি হয়। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।
আয়রন ঘাটতি ছাড়াও অ্যানিমিয়ার অন্যান্য কারণ
- ভিটামিন ঘাটতি
- ভিটামিন বি১২ ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি হলে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়।
- এ ধরনের অ্যানিমিয়ায় লোহিত রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয় এবং কার্যক্ষমতা কমে যায়।
- জেনেটিক রোগ
- থ্যালাসেমিয়া ও সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার বংশগত রোগ।
- এসব রোগে রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় এবং দ্রুত ভেঙে যায়।
- ক্রনিক রোগজনিত অ্যানিমিয়া
- দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, কিডনি রোগ, ক্যানসার বা অটোইমিউন রোগে অ্যানিমিয়া হতে পারে।
- এখানে আয়রন থাকলেও শরীর তা ব্যবহার করতে পারে না।
- রক্তক্ষরণ
- পাকস্থলী বা অন্ত্রের আলসার, হেমোরয়েড, অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ—এসব কারণে দীর্ঘমেয়াদে রক্তক্ষরণ হলে অ্যানিমিয়া হয়।
- অস্থিমজ্জার রোগ
- লিউকেমিয়া, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া বা যেকোনো ধরনের রক্তের ক্যানসারের মতো রোগে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না।
ভুল ধারণার ক্ষতি
শুধু আয়রন ঘাটতি ভেবে অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা করলে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। যেমন—
- থ্যালাসেমিয়া রোগীকে অতিরিক্ত আয়রন দিলে শরীরে আয়রন জমে গিয়ে হৃদযন্ত্র ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- ভিটামিন বি১২ ঘাটতির অ্যানিমিয়ায় আয়রন দিলে কোনো উপকার হয় না, বরং সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হয়।
সঠিক রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব
অ্যানিমিয়ার সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা অপরিহার্য।
- Complete Blood Count (CBC): রক্তকণিকার সংখ্যা ও আকার বোঝা যায়।
- Serum Ferritin: আয়রনের মজুদ আছে কি না, তা জানা যায়।
- Vitamin B12 ও Folate Test: ভিটামিন ঘাটতি আছে কি না, বোঝা যায়।
- Hemoglobin Electrophoresis: থ্যালাসেমিয়া বা অন্যান্য জেনেটিক রোগ শনাক্ত হয়।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
- আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া।
- গর্ভবতী ও শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
- থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা ও জেনেটিক কাউন্সেলিং।
- দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
রক্তস্বল্পতা মানেই আয়রনের ঘাটতি নয়— এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। অ্যানিমিয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, যা সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা করা জরুরি। শুধু আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং অনেক সময় তা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় সচেতনতা, সঠিক পরীক্ষা ও রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অপরিহার্য।
লেখক: রক্ত রোগ ও রক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল





