শৈশব বাঁধা পড়েছে ব্লাড ব্যাগে

১১ বছরের উম্মে হানীর জগৎ এখন চার দেয়ালে বন্দি। তার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর আকুতি জানিয়ে লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক ও গোলাম মোস্তাফিজার রহমান মিলন
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার নওনাপাড়া গ্রাম। প্রতিদিন ভোর হলেই এ গ্রামের মেঠোপথ ধরে দল বেঁধে মাদ্রাসায় ছোটে শিশুরা। কারও হাতে বই, কারও পায়ে ছুটে চলার আনন্দ, কেউ কেউ আবার খুনসুটিতে ব্যস্ত। কিন্তু এ কোলাহলের মধ্যে একটি ব্যতিক্রম আছে। গ্রামের এক ঘরের কোণে, ছোট্ট একটি বিছানায় শুয়ে থাকে ১১ বছরের উম্মে হানী। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, যেখানে তার সমবয়সীরা হেসেখেলে বেড়ে ওঠে।
হানী বিশাপাড়া দারুল হুদা দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ক্লাসের যে বেঞ্চে বসে মন দিয়ে পড়া শুনত, সেই বেঞ্চে প্রায় ১৮ মাস ধরে তার স্পর্শ পড়েনি। কারণ ওর শরীরের ভেতরে চলছে এক নিঃশব্দ যুদ্ধ-অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া নামের এক নির্মম ব্যাধির বিরুদ্ধে। এ গুরুতর ও বিরল রক্তের রোগের কারণে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত পরিমাণে নতুন রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাণ হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়।
হানীর শৈশব অন্য স্বাভাবিক শিশুদের মতোই প্রাণোচ্ছল ছিল। কিন্তু দেড় বছর আগে হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। ঘন ঘন জ্বর, ফ্যাকাশে মুখ, নেতিয়ে পড়া শরীর—এমন সব সমস্যা লেগে থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়ে তার মা-বাবাঁ। দিনাজপুর থেকে বগুড়ায় একের পর এক হাসপাতাল আর পরীক্ষার পর ধরা পড়ে সেই নিষ্ঠুর সত্য। হানীর অস্থিমজ্জা আর নতুন রক্ত তৈরি করতে পারছে না। শরীরের ভেতরের যে কারখানা প্রতিদিন প্রাণের রসদ জোগায়, সেটাই থমকে গেছে চিরতরে।
দিন যত গড়াচ্ছে, মেয়ের কষ্ট ততই বাড়ছে। মূল চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে যেকোনো মুহূর্তে ওকে হারিয়ে ফেলতে পারি
এখন প্রতি মাসে হানীর শরীরে দিতে হয় নতুন রক্ত। স্যালাইন আর ব্লাড ব্যাগ—এ দুটোর ওপর ভর করেই বেঁচে আছে ওর ছোট্ট জীবন। সময়মতো রক্ত না পেলে মুহূর্তেই নেতিয়ে পড়ে শরীর, দেখা দেয় মৃত্যুর ঝুঁকি। প্রতি মাসের সেই নির্দিষ্ট দিন এলেই পরিবারের সদস্যদের বুক কাঁপে। রক্ত জোগাড়, হাসপাতালে নেওয়ার টাকার ব্যবস্থা সময়মতো করা যাবে তো? চিকিৎসকরা অবশ্য বলেছেন, হানীকে সুস্থ করার একটাই পথ খোলা আছে—ঢাকায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাতে হবে। এই একটি চিকিৎসাই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে শৈশবের হারানো রঙিন মুহূর্তগুলো। কিন্তু এই আশার পথে দাঁড়িয়ে আছে এক পাহাড়সম বাধা। চিকিৎসায় খরচ পড়বে ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা। হানীর পরিবারের কাছে অঙ্কটা আকাশছোঁয়া। বাবা হানিফ উদ্দিন পেশায় একজন সবজি বিক্রেতা। মেয়ের চিকিৎসা আর ওষুধের খরচ জোগাতে গিয়ে বিক্রি করে দিতে হয়েছে তার শেষসম্বল।
মেয়েকে দিনে দিনে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে বাবার কণ্ঠ ভেঙে পড়ে, ‘নিজের একমাত্র দোকানটাও বেচে দিলাম, কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব?’ হানীর পাশে বসে চোখ মুছতে মুছতে মা ছালমা বেগম বললেন, ‘দিন যত গড়াচ্ছে, মেয়ের কষ্ট ততই বাড়ছে। মূল চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে যেকোনো মুহূর্তে ওকে হারিয়ে ফেলতে পারি।’
টাকার অঙ্কটা এ নিঃস্ব পরিবারের কাছে পাহাড়সম হলেও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা যদি সাধ্যমতো একটু একটু করে হাত বাড়ান, তাহলে তা জোগাড় করা সম্ভব।
সাহায্যের জন্য
বিকাশ, নগদ ও রকেট
০১৭৮০৯১৮০৪৯








