১০০ টাকায় ঢাকায়...
- ঢাকার দুই সিটি নাগরিকদের প্রায় ১০০টি সেবা দেয় ১০০ টাকার মধ্যে। যার মধ্যে ৯০টির বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক। বাকি ১০টির মতো সাধারণ নাগরিক সেবা

অঙ্কন: অরবিন্দ
গত ঈদুল ফিতরে বসের কাছে বর্ণার আবদার ছিল ৫০০ টাকা সালামি। কিন্তু অনেক পীড়াপীড়ি করেও সে ১০০ টাকার বেশি আদায় করতে পারল না। বস কিছুতেই ১০০ টাকার বেশি দিলেন না বর্ণাকে। নিদারুণ করুণ মুখে টাকাটা নিয়ে বর্ণা বলল, ‘ঢাকা শহরে এখন ১০০ টাকায় কিছুই পাওয়া যায় না, ভাই।’ আসলেই কি ১০০ টাকায় কিছুই মেলে না রাজধানীতে?
মেলে। মেলে। ঢাকায় ১০০ টাকার বিনিময়ে বহু সেবা নিয়ে আপনার অপেক্ষায় দুই সিটি করপোরেশন। শুধু কি তাই! দুই সিটি কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু সেবা বিনামূল্যেও দিয়ে থাকে। আসুন দেখি ১০০ টাকায় কী কী সেবা দেয় এ দুই সেবা সংস্থা।
তথ্য বলছে, ঢাকার দুই সিটি নাগরিকদের প্রায় ১০০টি সেবা দেয় ১০০ টাকার মধ্যে। যার মধ্যে ৯০টির বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক। বাকি ১০টির মতো সাধারণ নাগরিক সেবা। জন্মসনদ ফি ৫০ টাকা। তবে জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে সনদ করালে সেটি মেলে একেবারে বিনামূল্যে। চারিত্রিক সনদ, মৃত্যুসনদও টাকা ছাড়াই সরবরাহ করে দুই সিটি করপোরেশন। সংস্থা দুটির সব আঞ্চলিক অফিস এবং ওয়ার্ড অফিস এসব সেবার সঙ্গে যুক্ত।
এবার আসি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মোট স্বাস্থ্যসেবা দানকেন্দ্র ৩৬টি। এর ৩০টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং বাকি ৬টি মাতৃসদন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মোট সেবাকেন্দ্র ৪০টি। ৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ৬টি মাতৃসদন এবং ৩টি হাসপাতাল।
মাতৃসদনগুলো ২৪ ঘণ্টাই খোলা। তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো খোলা সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। শুক্রবার ছাড়াও সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বহু নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র মানুষ সেবা নেয়। অতিদরিদ্র মানুষের জন্য এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ মানুষকে সর্বনিম্ন মূল্যে বা রেড কার্ড সেবা দেওয়া হয়।
ভাবা যায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে মাত্র ১০০ টাকায় মেলে অভিজ্ঞ এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ! আরও আছে, মাত্র ১০০ টাকায় মিলছে রক্তের রুটিন পরীক্ষা, চোখের প্রাথমিক পরীক্ষা এবং নারীদের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সারভাইকাল ক্যানসারের স্ক্রিনিংয়ের মতো আধুনিক সেবা। ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতা প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্তের জন্য ব্লাড সুগার এবং প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষাও করা যাচ্ছে মাত্র ৬০ টাকায়। সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, ঢাকার শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ১০টি অতিপ্রয়োজনীয় প্রতিষেধক টিকা এবং ডেঙ্গু টেস্টের মতো ব্যয়বহুল পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। দুই সিটি করপোরেশনে সনদের ফি একই হলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ফিতে কিছুটা তারতম্য আছে।
নামমাত্র দামে নাগরিকদের সেবাদান প্রসঙ্গে কথা হয় ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরীর সঙ্গে। তার কথায়, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নগরবাসীর দোরগোড়ায় মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষেরা যেন ১০০ টাকার মধ্যেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই আমাদের কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে। মাত্র ১০০ টাকায় বা তার চেয়েও কম খরচে আমরা যে সেবাগুলো দিচ্ছি, তা বেসরকারি পর্যায়ে আকাশচুম্বী।’ এত কিছুর পরও সেবাগ্রহীতা খুব একটা বাড়ছে না বলে সংযোজন তার।
ডিএসসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীনের মতে, ‘নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এখন অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী করা হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা যাতে কোনো হয়রানি ছাড়া এ সেবাগুলো পান, তা আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি।’ আগামীতে সেবার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সস্তায় সেবার সন্ধান খুব একটা রাখেন না নগরবাসী। শুক্রাবাদে ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ের পাশেই থাকেন সায়রা বানু। তিনি জানেনই না কোথায় সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ষাটোর্ধ্ব এই নারীর কথা, ‘জানলে কি আর এত্ত এত্ত টাকা খরচ করে বেসরকারি ডাক্তার দেখাই?’
নগরবাসীর না জানার খবরটি উঠে এসেছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কথায়ও। ডা. বে-নজির আহমেদ বলেছেন, ‘এখনো বহু মানুষ জানেন না যে এত কম খরচে বা বিনামূল্যে এত চমৎকার সেবা পাওয়া সম্ভব। এর সফলতার জন্য দরকার ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা।’
একটু থেমে এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যোগ করলেন, ‘ঢাকার দুই সিটির এ স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্যসেবাগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়।’






