ঢাকার শাঁখারীবাজার

তিন দশক আগে লেখকের ক্যামেরায় শাঁখারীবাজার
শাঁখারিদের তৈরি শাঁখার জন্য বিখ্যাত ছিল ঢাকা। ঢাকায় শাঁখারিদের আবাসিক এলাকা শাঁখারীবাজার এখনো বহন করছে সেই ঐতিহ্য ও স্মৃতি। ১৬৬৬ সালে ‘ট্যাভার্নিয়ার’ নামক একজন ইউরোপীয় পর্যটক ঢাকায় এসেছিলেন এবং পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এবং তাদের শিল্পকর্ম দেখে বেশ অভিভূত হয়েছিলেন। ১৮৪০ সালে জেমস টেলরের ‘স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’ গ্রন্থে শাঁখারি সম্প্রদায় এবং শঙ্খশিল্প— এ দুই সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তার মতে, শহর পত্তনের সময়ই শাঁখারি সমাজ ঢাকায় প্রথম আসে। কিন্তু ‘জেমস ওয়াইস’ মনে করেন, ‘রাজা বল্লাল সেনের সময়কালে (রাজত্বকাল: ১১৬০-৭৮) শাঁখারি সম্প্রদায় পূর্ববঙ্গ তথা ঢাকা শহরের এ অঞ্চলে আখড়া করে। সতেরো শতকে মুঘলরা ঢাকায় এলে শাঁখারিদের নতুন শহর ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল লাখেরাজ জমির (খাজনাবিহীন জমি) প্রলোভন দেখিয়ে। তবে আরেক গবেষণায় চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে শাঁখারি সম্প্রদায় ও শঙ্খশিল্পের অস্তিত্ব সম্পর্কে নানা ঐতিহাসিক-পৌরাণিক-সাহিত্যিক নিদর্শন ও তথ্য পাওয়া যায়।
তামিলনাড়ু, দাক্ষিণাত্য এবং গুজরাটের পরেই শাঁখারিদের সবচেয়ে বেশি প্রসার ঘটে আজকের শাঁখারীবাজার নামক স্থানেই। হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় শ্রেণির লোকেরাই শঙ্খকে অতি পবিত্র সামগ্রী বলে মনে করেন। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের সময়ে দেশীয় মেয়েরা যে শাঁখা পরত, তা ঢাকার শাঁখারীবাজারেই পাওয়া যেত।
শাঁখারিদের বাসগৃহের স্থাপত্য একটু স্বতন্ত্র ধরনের। তাদের দেওয়া লাখেরাজ জমির আয়তন ছিল খুব ক্ষুদ্র। সেই আয়তন মেনেই নির্মিত হতো বাসগৃহ। সাধারণত এগুেলা ছিল দোতলা। সামনের মূল ফটক হতো ছয় ফুটের মতো। তারপর ২০-৩০ ফুটের মতো লম্বা করিডর চলে যেত ভেতরে। পার্শ্ববর্তী দেয়ালগুলো দরজা বা জানালাবিহীন নিশ্ছিদ্র এবং পশ্চাৎদিকে ২০ গজ পর্যন্ত প্রসারিত। দালানের শুধু শেষ প্রান্তরগুলো ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত এবং একতলার ওপরের মধ্যবর্তী স্থান একটি ছোট্ট প্রাঙ্গণের মতো খোলা রাখা হতো। খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা এখনো বসবাস করেন।
তবে শাঁখারিরা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও কর্মঠ জাতি। উনিশ শতকের শেষভাগে ঢাকার শাঁখারীবাজার থেকেই বাংলার হিন্দু নারীদের শাখা সরবরাহ করা হতো। ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত শাঁখারীবাজারের কোনো শাঁখারিকেই জমির জন্য কোনো খাজনা দিতে হতো না। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) সময় শাঁখারিরা তাদের লাখেরাজ জমির সনদপত্র দেখাতে না পারায় তাদের খাজনার আওতায় আনা হয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী শাঁখারীবাজার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। শাঁখারীবাজারের বাড়িগুলো খুব সামান্য হলেও অসাধারণ সিমেন্টের নকশা (স্ট্যাকো ডেকোরেশন) পাওয়া যেত। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের মিথ্যা সংস্কারের আশ্বাস এবং নানা ধরনের ভয়ভীতির কারণে তারা নিজেরা এমন অপরিকল্পিত সংস্কার করে, যা আগের বাহ্যিক সৌন্দর্য আর দেখতে পাওয়া যায় না।




