আমার কাছে পাখি প্রকৃতির উড়ন্ত ফুল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পেশাগত জীবনে আনসার উদ্দিন খান পাঠান ছিলেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পুলিশ একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন দীর্ঘ সময়। কিন্তু তার নেশা পাখির ছবি তোলা। বাংলাদেশে ৭২১ প্রজাতির পাখির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৫০ প্রজাতির পাখির ছবি তার ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে। বিচিত্র ধরনের পাখির প্রায় ১৫ হাজার ছবি রয়েছে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়।
ঘুরে ঘুরে ছবি তোলেন নানা জায়গায়। কখনো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে রহস্যময় প্রকৃতির বিবরণ অথবা উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় নির্ঘুম গভীর প্রকৃতির দর্শন তাকে নিয়ে যায় অন্য এক অনুভূতির কাছে।
এ ঢাকা শহরেই তার বসবাস। অবশ্য চাকরিজীবন থেকে অবসর নিয়েও তার ছুটি মেলেনি। এখন সরকারের একটি উচ্চপদে প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার টান তাকে পৌঁছে দিয়েছে পাখিদের দেশে। সেখানে তার একাগ্র ভ্রমণ। কখনো পাহাড়ে, কখনো নদীর বিস্তৃত চরে আবার কখনো গ্রামের পথে-প্রান্তরে অক্লান্তভাবে চলে তার ছবি তোলার কাজ। তরুণ বয়সে এক প্রবাসী বন্ধুর উপহার দেওয়া ইয়াসিকা ব্র্যান্ডের ক্যামেরা দিয়ে শুরু হয়েছিল তার ছবি তোলার গল্প। তারপর পুলিশের কঠিন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জড়িয়ে গেছেন পাখির ছবি তোলার তীব্র আকর্ষণে।
‘শুধু পাখির ছবি আপনার আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠল, মানুষের ছবি কেন আকর্ষণ করেনি?
‘শুরুতে প্রকৃতির ছবি তুলতাম। একটা সময়ে আবিষ্কার করলাম, সেই প্রকৃতির প্রধান একটি চরিত্র পাখি; সে যেন প্রকৃতির উড়ন্ত ফুলের মতো। অনুভূতির মধ্যে পাখি এসে ভর করতে শুরু করল, তখন থেকে পাখির ছবি তোলা আগ্রহের বিষয় হয়ে গেল, মানুষের প্রতিকৃতি আমাকে আর আকর্ষণ করেনি।’
পাআনসার উদ্দিন খান পাঠান লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। তার জীবন শুরুর সময় কেটেছে গ্রামের অবারিত সবুজের মধ্যে। সেই প্রকৃতি সাহিত্যের ছাত্রের মনে তৈরি করেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস। তাই পাখি তার কাছে সেই প্রকৃতির মূল একটি চরিত্রে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি স্থির, কিন্তু পাখি সচল। আনসার উদ্দিন খান মনে করেন, সবুজ সীমানার মধ্যে পাখি তার কাছে প্রকৃতিকে অনুভব করার আরেকটি পথ হয়ে ধরা দিয়েছে।
‘পেশা কখনো ছবি তোলার আগ্রহের বিরোধী পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়নি?’
‘দাঁড়িয়েছে। চাকরি জীবনের শুরুতে ছবি তোলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আগ্রহের মৃত্যু ঘটুক, তা চাইনি। তখন অবসর সময়টিকে ছবি তোলার কাজে ব্যবহার করেছি। চাকরিসূত্রে সিলেটে অনেকটা সময় কাজ করতে হয়েছে। সেখানকার চা বাগান, পাহাড়, নদী— ছবি তোলার জন্য আরও বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। বিচিত্র পাখির জগৎ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে আমার ক্যামেরার লেন্সে।’
কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাতির বাইরে আরও অসংখ্য পাখি আছে। বিভিন্ন ঋতুতে তাদের আগমন ঘটে। আবার সেই নির্দিষ্ট ঋতু ফুরিয়ে গেলে তারা আবার নিজেদের জন্য স্বস্তিদায়ক কোনো জায়গায় চলে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকেও পাখি আসে বাংলাদেশে। আনসার উদ্দিন খান পরিচিত পাখিদের বাইরে সেই কম পরিচিত পাখির ছবি তুলতে বেশি আগ্রহী।
প্রশ্ন করেছিলাম, পাখির কোন কোন দিকটি তাকে বেশি আকর্ষণ করে— বিচিত্র বর্ণ না তাদের আলাদা আলাদা জীবনাচারণ? হেসে জানালেন, পাখির বর্ণ-বৈচিত্র্য তো আছেই কিন্তু তাদের অদ্ভুত জীবনপ্রণালি, পরিব্রাজকদের মতো জীবন তাকে বেশি আকর্ষণ করে।
‘কখনো ভবঘুরে জীবনের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছেন?’
প্রশ্নটা শুনে একটু কথায় বিরতি নিলেন। তারপর বললেন সেরকম একটা জীবনের প্রতি আজও আমার আকর্ষণ রয়ে গেছে। কখনো ভাবি, এসব ছেড়েছুড়ে চলে যাব গ্রামে। সেখানে প্রকৃতির মধ্যে জীবনের বাকি সময় কাটিয়ে দেব পাখির ছবি তুলে।’
নিজের গ্রামে দিঘি এবং একটি জায়গায় প্রচুর গাছ লাগিয়ে অরণ্য তৈরি করেছেন আনসার উদ্দিন খান। পাখিদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করতে চান তিনি। সেখানে পাখি আসে। তিনি ছুটির দিনে এখনো গ্রামে চলে যান পাখির ছবি তুলতে। তার সংগ্রহে জমে ওঠে বিচিত্র ধরনের পাখির ছবি।





