দ্য ওয়ান্ডার সার্কাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ছোট শহর হোপটাউন। খুব সাধারণ, শান্ত— যেখানে সারা বছর বলার মতো তেমন কিছুই ঘটে না। প্রতি বছর শরতের শুরুতে হোপটাউনে তাঁবু ফেলে দ্য ওয়ান্ডার সার্কাস। কয়েক দিনের জন্য ছোট্ট শহরটাকে প্রাণবন্ত করে তোলে তারা।
এ বছর শো শুরু হচ্ছে সন্ধ্যা ৬টার দিকে। প্রথমে এমা প্রেস্টনের দল নিয়ে আসে অ্যাক্রোবেটিক শো— লাফ, এক চাকার সাইকেলে কসরত, দড়ির ওপর হাঁটা। এরপর আসে তুমুল জনপ্রিয় ছুরি নিক্ষেপের খেলা, যেটিতে পারফর্মার এরিক ডানডার তার সহকারীকে বোর্ডের মাঝখানে রেখে চারপাশের বোর্ডে ছুরি মারতে থাকে। দর্শক টানটান উত্তেজনা নিয়ে বসে দেখে, এই বুঝি কোনো অঘটন ঘটল; কিন্তু সবাইকে অবাক করে প্রতিবারই অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করে এরিক, অর্থাৎ সহকারী অক্ষত থাকে। এরপর আসে টোবি স্নোর আগুনের খেলা। আগুন জ্বালানোর বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে নাচ, লাঠি ঘোরানো ও বিভিন্ন কসরত দেখায়।
সবশেষে আসে ক্লাউন। ক্লাউন চরিত্রটিকে বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। কারণ সে জাগলিং খেলা দেখায়, কাঁধের থলে থেকে চকলেট বের করে দেয় আর অদ্ভুত সব হাস্যকর কাণ্ড করে। যেটি দেখে শুধু বাচ্চারা না, বড়রাও হেসে কুটিকুটি।
কিন্তু তৃতীয় দিনের শো শেষে নিজের ড্রেসিংরুমে খুন হয়ে গেল সার্কাসের ক্লাউন। ভোর হতেই তাকে আবিষ্কার করল ঝাড়ুদার ছেলেটা। হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন করে শহরের একমাত্র পুলিশ স্টেশনে। হোপটাউনে এরকম খুনখারাবি খুব একটা ঘটে না, তাও আবার সবার পরিচিত প্রিয় সার্কাসের ক্লাউন। তাই মুহূর্তে গোটা শহরে খবরটা চাউর হয়ে গেছে। চিফ কনস্টেবল বব মিলার হন্তদন্ত ভঙ্গিতে দুই গাড়ি পুলিশ নিয়ে হাজির হলেন।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে থামল রজার ম্যাকব্রায়ানের গাড়ি। রজার স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাবেক গোয়েন্দা। অনেক জটিল কেস সমাধানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রজারের নাম। এক কেসে চোট পেয়ে আগাম রিটায়ারমেন্টে চলে যায়, ফিরে আসে জন্মভূমি হোপটাউনে। কিন্তু গোয়েন্দাগিরি ছাড়েনি; খুলে বসেছে প্রাইভেট এজেন্সি। আশপাশের শহরে কোনো ঝামেলার কেস এলে ডাক পড়ে রজারের। সে আবার ববের ছেলেবেলার বন্ধু। এত বড় একটা দুর্ঘটনাস্থলে বন্ধুকে না নিয়ে আসতে চায়নি বব।
মূল তাঁবু, যেখানে খেলা দেখানো হয়, সেটির পাশে কয়েকটি সাজগোজের ট্রেলার— এখানেই খেলার আগে পোশাক, মেকআপ পরে মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আর সার্কাসের দল প্রতিবারের মতো এবারও উঠেছে সবচেয়ে কাছের হোটেলে। এরই মধ্যে সার্কাসের সবাই প্রায় এসে গেছে। কয়েকজন পুলিশ ভিড় সামলাতে ব্যস্ত।
দুজন পুলিশ সহকারীসহ রজারকে নিয়ে ট্রেলারে প্রবেশ করল বব। সঙ্গে সার্কাসের ম্যানেজার স্কট টাকার। ট্রেলারের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ক্লাউন। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মেকআপের বক্স থেকে টুকিটাকি মেকআপের সরঞ্জাম। পিঠে বিঁধে আছে একটা ছুরি। স্কট বলে উঠল, ‘আরে, এ তো দেখি এরিকের ছোরা!’ জানাল এই নির্মম ঘটনার শিকার সার্কাসের নতুন সদস্য ম্যাথিও হিল। ম্যাথিওকে আনা হয়েছিল এবার নিয়মিত পারফর্মার ক্লাউন ম্যাক্সের সঙ্গে ট্রেনিংয়ের জন্য। ম্যাক্স হঠাৎ কাল সকালে চলে গেছে নিজের শহর ব্যাটফোর্ডে। তাই বাধ্য হয়ে ম্যাথিওকে ক্লাউন সাজতে হয় কাল রাতে। খারাপ করেনি ছেলেটি। স্কট ছাড়া আর কেউ জানতও না এই অকস্মাৎ পরিবর্তনের কথা। কেউ নাকি ধরতেই পারেনি যে এটি ম্যাথিওর প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স!
মাথায় কয়েকটি প্রশ্ন এসেছিল, কিন্তু আপাতত চেপে গেল রজার। সাবধানে সব ঘুরে ঘুরে দেখছে ববের সঙ্গে। হঠাৎ নিচু হয়ে কী একটা তুলল। সার্কাসের একটা পোস্টার— এ-ফোর সাইজের অর্ধেক আকারের কাগজে। এই পোস্টারটাই এবার সারা শহরে প্রচারণায় ব্যবহার করেছে ওয়ান্ডার সার্কাস। কাগজটির উল্টো পিঠে চারটি ইংরেজি অক্ষর— m o u s। মনে হচ্ছে, লিপস্টিক জাতীয় কিছু দিয়ে লেখা। উল্টে পড়া মেকআপ বক্সের সরঞ্জামের মধ্যে সহজেই মিলে গেল লাল রঙের ওই লিপস্টিক!
‘এরিকের ছোরাগুলো কোথায় থাকে?’ আঙুল তুলে একটা কম্বিনেশন লকওয়ালা কাঠের বাক্স দেখালেন স্কট। বললেন, ‘এর কম্বিনেশন এরিক ও তার সহযোগী ছাড়া আমিই শুধু জানি।’ ‘হুম, তাহলে খুনি ওই দুজনের একজন হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই’— স্বগতোক্তি করল বব। ‘তবে তালার কম্বিনেশন সার্কাসের অন্য কারও জানতেও কি খুব বেগ পেতে হবে?’ ‘তা, কী যেন বলছিলেন, ম্যাক্স কাল সকালে শো ছেড়ে চলে গেছে নাকি?’
‘আর বলবেন না। ম্যাক্সের মতিগতি কয়েক দিন থেকে আমার ভালো লাগছিল না। আসলে ওর রেকর্ড ভালো না। পুরনো যে সার্কাসে ছিল, সেখানেও মারধর করে চলে এসেছে। আমি আগে জানতাম। তাই ম্যাথিওকে নিয়ে আসি যেন ক্লাউনের কাজটা ওকে দিতে পারি। বয়স আর গড়নে দুজনে প্রায় সমানে সমান। ম্যাক্স ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রাগারাগি করে। পরে বলে যে আমি কোনো কিছু শেখাব না ম্যাথিওকে। দেখি, তুমি এবার সার্কাস কীভাবে চালাও! আর সে নিজের বাড়িতে চলে যাবে বলে কাল সকালে রওনা হয়ে গেল।’
রজার তখন ববকে বলল, ‘খোঁজ নাও তো আসলে কোথায় ম্যাক্স। হয়তো কোত্থাও যায়নি, এখানেই ছিল। হিংসা করে ছোরা মেরে বসেছে কি না ম্যাথিওকে? তাহলে সন্দেহের তালিকায় এরিক, এরিকের সহযোগী আর ম্যাক্স রইল আপাতত। বাকিদের কোথাও যেতে দিও না। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করো। আর আমি দেখি
m o u s শব্দটার মানে উদ্ধার করা যায় কি না। তা ওহে ম্যানেজার সাহের, মিকি মাউসের কোনো খেলা দেখান নাকি আপনারা?’
স্কট বলল, ‘না এ রকম কোনো খেলা তো আমাদের নেই! তা ছাড়া কোনো ইঁদুরের উপদ্রবও নেই এখানে।’
রজার বলল, ‘হুমম, ভাবতে হবে! মনে হচ্ছে, আততায়ীর নামটা লিখে যেতে চেয়েছিল ম্যাথিও। সরাসরি না হলেও কোনো সংকেতে। হয়তো শব্দটা শেষ করে যেতে পারেনি বেচারা।’
‘যেভাবেই হোক, খুনিকে বের করুন। আমার এতদিনের সার্কাসে এই প্রথম এত বড় কেলেঙ্কারি!’— স্কটের কণ্ঠে আকুতি। ‘কাজটা ভেতরের কারোরই হবে। খুনি ধরা পড়লে আমার নাকটা কাটা পড়বেই, কিন্তু কী আর করা।’
পরের দুদিন বব সবার জবানবন্দি জোগাড় করল। আর রজার তার পুরনো বন্ধুদের সাহায্যে বের করতে চেষ্টা করল ওয়ান্ডার সার্কাসের কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড, অতীতের রেকর্ড, নিজেদের মধ্যে কোনো পূর্বশত্রুতা আছে কি না ইত্যাদি।
রজারের সাহায্য নিয়ে বব পুরো ঘটনাটা একবার সাজিয়ে নিল। সার্কাসের সিকোয়েন্সটা হলো অ্যাক্রোবেটিক শো > ছুরি নিক্ষেপ > আগুনের খেলা > ক্লাউন। ৬টা থেকে ৯টা। ক্লাউনের মেকআপ তুলতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। তাই শো শেষে ও হোটেলে ফেরে সবার শেষে। ম্যানেজার স্কট সাধারণত শেষ পর্যন্ত থাকলেও ওইদিন নাকি ওর মাথা ধরেছিল, তাই ম্যাথিওকে বলে সে আগেভাগে হোটেলে চলে যায়। তার মানে রাতের দিকে ট্রেলারে ছিল ম্যাথিও, আর আততায়ীও আশপাশে কোথাও। ট্রেলারে কোথাও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। তার মানে যে ঢুকেছিল, সেটি অস্বাভাবিক মনে না হওয়ায় ম্যাথিও তাকে বাধাও দেয়নি। মওকা বুঝে পেছন থেকে ছোরা মেরে পালিয়ে যায় খুনি। প্রশ্ন হলো মোটিভটা কী? আর কাগজে অক্ষরগুলো লিখে কীসের ইঙ্গিত দিল ম্যাথিও?
‘গোলমেলে। বুঝলে বব?’ রজার বলল। ‘সন্দেহের তালিকাটা এত লম্বা! আর এই হতচ্ছাড়া ইঁদুরটা এলো কোথা থেকে! তাও যদি পুরো লিখে শব্দটা শেষ করে দিয়ে যেত ম্যাথিও। আমাকে আজকে রাতটা ভাবতে দাও। সকালে দেখা হবে।’
২
‘দেখো। লক্ষ করো। সব দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করো। অনেক সময় আসল উত্তরটি তোমার চোখের সামনেই পড়ে থাকে।’ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের প্রশিক্ষণে শেখা বাণীটি ক্যারিয়ারে সবসময় মনে রেখেছে রজার।
ডেস্ক ল্যাম্পের আলোয় রজার খুঁটিয়ে দেখছে পোস্টারটা, যার সাদা পিঠে লিপস্টিকে লেখা চারটি ইংরেজি অক্ষর— m o u s। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরখ করল। আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখল। ঘুরিয়ে দেখল। উল্টে দেখল, পাল্টে দেখল।
৩
পর দিন সন্ধ্যা ৬টা। তাঁবুর ভেতরে আজ আয়োজনটা একটু অন্য রকম। সামনের সিটগুলো দখলে নিয়ে আছে সার্কাসেরই সব পারফর্মার। আশপাশে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে কিংবা বসে। নিজের বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছে ম্যাক্সকেও। মঞ্চে আজ পারফর্মার শুধু দুজন— বব আর রজার।
গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন বব, ‘যে কারণে আমরা এখানে, তা সবার জানা। বেশি সময় নেব না আমি। খুনের মোটিভ নিয়ে বেশ ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম আমরা। নতুন ছেলেটার ওপর কার এত আক্রোশ থাকতে পারে? আপনাদের সবার অতীত রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে পাওয়া গেল চমকপ্রদ তথ্য। ম্যাক্স যে সার্কাসে মারধর করে পালিয়েছে, সেখানে কাজ করত এ সার্কাসেরই আরেকজন! পুরনো বিবাদটা কোনো কারণে চরমে উঠেছিল। টিকতে না পেরে বাড়ি চলে গিয়েছিল ম্যাক্স। ক্লাউনের সাজের আড়ালে যে আজ ম্যাথিও ছিল, এটা স্কট ছাড়া আর কেউ জানত না। দুর্ভাগ্যক্রমে বেছে বেছে আজকের দিনটাকেই বেছে নিয়েছিল খুনি; ম্যাক্সের জায়গায় প্রাণ গেল বেচারা ম্যাথিওর। তবে আমার বন্ধু রজারের কল্যাণে শেষরক্ষা হলো না। মরার আগে ঠিকই খুনির পরিচয় লিখে গেছে ম্যাথিও; আর সেটি বের করেছে রজার!’
বলুন তো পাঠক, ম্যাথিওর লেখা থেকে কীভাবে খুনিকে বের করেছিল রজার?



