গ্রামীণফোনের সিএইচআরও বললেন
দ্রুত পদোন্নতির চেয়ে আত্মমূল্যায়ন জরুরি

সৈয়দা তাহিয়া হোসেন। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ক্যারিয়ার সম্পর্কিত জরুরি কিছু প্রশ্নের সমাধান দিয়েছেন গ্রামীণফোনের চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার সৈয়দা তাহিয়া হোসেন। তার মুখোমুখি হয়েছিলেন স্বর্ণা রায়
টেলিকম ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে একজন প্রার্থীর কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি এখন ফোনকলের গণ্ডি পেরিয়ে ওটিটি, ডেটা ও এআইয়ের মতো ডিজিটাল সেবায় রূপান্তর হচ্ছে। তাই এখানে ক্যারিয়ার গড়তে শুধু অ্যাকাডেমিক ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে বাস্তব কিছু প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, টেলিকমশিল্প খাতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কী করছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু তাত্ত্বিক পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি।
টেলিকমশিল্প খাতের কাজে শুধু ব্যবসায় প্রশাসন ব্যাকগ্রাউন্ডেরই সুবিধা থাকে?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : এটি নির্ভর করে আপনি কোন পদের জন্য আবেদন করছেন, তার ওপর। সমাজবিজ্ঞান পড়েও করপোরেটে ভালো করা সম্ভব, আবার বিবিএ পড়েও সব পদে কাজ করা যায় না। আমাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অনলাইন টেস্টের মাধ্যমে প্রার্থীর শুধু প্রকৃত প্রযুক্তিগত দক্ষতাই যাচাই করা হয়; সার্টিফিকেট কোথা থেকে এলো, তা বড় বিষয় নয়।
৯০ দিনের ইন্টার্নশিপে আসা একজন তরুণের কাছ থেকে আপনাদের প্রত্যাশা কী থাকে?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : গ্রামীণফোনে ইন্টার্নদের শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য নেওয়া হয় না। আমরা তাদের নির্দিষ্ট প্রজেক্টে যুক্ত করি, যাতে তারা শিখতে এবং কন্ট্রিবিউট করতে পারেন। প্রত্যাশা করি, তারা যেন নিজেদের শুধু শিক্ষার্থী না ভেবে গ্রামীণফোনের নিয়মিত কর্মী হিসেবে ভাবেন এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন।
নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেন?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : শুধু অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে সবকিছু বিচার করা সম্ভব নয়। তাই আমরা বোঝার চেষ্টা করি, প্রার্থী চলমান পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে কতটা সচেতন। পাশাপাশি ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা, কোনো প্রজেক্টে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের দক্ষতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, শেখার ইচ্ছা কতটুকু— সেসবকে বেশি গুরুত্ব দিই।
বর্তমান করপোরেট দুনিয়ায় জেন-জিদের কাজের ধরন নিয়ে অনেকে অভিযোগ করেন। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : জেন-জিদের সঙ্গে কাজ করা কঠিন, এমনটা আমাদের মনে হয় না। হ্যাঁ, তাদের কাজের ধরন আলাদা। তবে আমাদের সময় যেগুলো ছিল না, এমন সব প্রযুক্তির জ্ঞান তাদের অনেক বেশি। আমরা তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখছি। তরুণদের জন্য পরামর্শ হলো, ক্যারিয়ারে দ্রুত পদোন্নতির চেয়ে আপনি আসলে কতটা শিখলেন, সেই আত্মমূল্যায়ন করা জরুরি।
শুরুতে অনেকেই মনে করত, এআই চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু এখন দেখছি, এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও নিখুঁত এবং কাজের গতিকে বাড়াতে সহযোগিতা করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান নিয়ে অনেকেই চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন। এইচআর লিডার হিসেবে আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : আমরা এরই মধ্যে এআই ব্যবহার করছি। শুরুতে অনেকেই মনে করত, এআই চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু এখন দেখছি, এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও নিখুঁত এবং কাজের গতি বাড়াতে সহযোগিতা করছে। কিছু চিরাচরিত পদ হয়তো বিলুপ্ত হবে; কিন্তু তার বিপরীতে শত শত নতুন ধরনের পদের সৃষ্টি ঘটবে। তাই চাকরি হারানোর ভয় না পেয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির সঙ্গে আপডেট রাখাই টিকে থাকার একমাত্র উপায়।
ক্যারিয়ারে ভালো করতে হলে দিন-রাত এক করে অফিসে পড়ে থাকতে হবে— এই মানসিকতা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : যত বেশি সময় দেওয়া যাবে, তত ভালো ক্যারিয়ার হবে— এমন ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। অফিসে থাকা কর্মঘণ্টায় আপনি কতটা মনোযোগ দিয়ে এবং শতভাগ উজাড় করে কাজ করছেন, সেটিই আসল। তবে জীবনের একেকটি ধাপে অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে; কখনো ক্যারিয়ার তো কখনো পরিবার। পুরো বিষয়টি আপনি কীভাবে সমন্বয় করছেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন নিয়োগকর্তা হিসেবে যোগাযোগ দক্ষতার মাধ্যমে আপনারা ঠিক কী খোঁজেন?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : অনেকের ধারণা, গড়গড় করে ইংরেজি বা বাংলা বলতে পারাই আসল যোগাযোগ দক্ষতা। অথচ বিষয়টি তা নয়। আমাদের কাছে প্রকৃত যোগাযোগ দক্ষতা হলো যেকোনো বক্তব্য বা প্রশ্ন সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতা, নিজের বার্তাটি অন্য পক্ষের কাছে সহজ ও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং তারা সেটি সঠিকভাবে গ্রহণ করছে কি না, তা বুঝতে পারা।
কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে রাখতে গ্রামীণফোন বিশেষ কী উদ্যোগ নিয়েছে?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি কর্মীদের একটি ইতিবাচক ও বৈষম্যহীন কাজের পরিবেশ দেওয়ার ওপরও এই প্রতিষ্ঠান বিশেষ গুরুত্ব দেয়। লিঙ্গভিত্তিক কোনো ভেদাভেদ না রেখে প্রত্যেক কর্মী যাতে নিজ নিজ যোগ্যতায় অবদান রাখতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ পান, সেই পরিবেশ এখানে বজায় রাখা হয়।
নারী করপোরেট লিডার হিসেবে আপনার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কেমন?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : কর্মক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর নিজেকে কিছুটা বেশি প্রমাণ করতে হয়, এটি আমাদের সমাজের একটি চেনা চিত্র। তবে কাজের প্রভাব যখন দৃশ্যমান হয়, তখন প্রতিষ্ঠান তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য। পরিবার ও সন্তান সামলানোর জন্য কাজের বাইরে নারীকে একটু বেশি লড়াই করতে হয়। তবে অভিযোগ না করে, আপন মনে পুরো বিষয়কে গুছিয়ে নিতে এবং আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্যের সঙ্গে সমাধান খুঁজতে হবে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কাজে ফেরা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো অনেক নারীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
সৈয়দা তাহিয়া হোসেন : মাতৃত্বকালীন ছুটি একটি আইনি অধিকার। তবে ছুটির সময়েও নিজেকে শেখার প্রক্রিয়া বা নতুন তথ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখা থামানো উচিত নয়। আমাদের দেশে সন্তান লালনপালনে সাহায্যের জন্য পারিবারিক বা সামাজিক সহযোগিতা পাওয়া সহজ। তাই নিজেকে একেবারে গুটিয়ে না নিয়ে, ছুটির সময়েও মানসিকভাবে কর্মক্ষম ও আপডেটেড রাখতে পারলে কাজে ফেরা সহজ হয়।








