স্টেশন প্রাণবন্ত রাখে শিক্ষার্থীদের

ছবি : জনি হোসাইন
শিক্ষার্থীদের অবসর বিনোদন ও আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন’। শিক্ষার্থীদের জন্য শাটল ট্রেন চালু হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পর, ১৯৭৯ সালে। একই সঙ্গে নির্মিত হয় শাটলের ঘর, বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন। প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকে রেলস্টেশন। বিকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। ছেলেমেয়েদের আড্ডাই যেন স্টেশনের প্রাণ। কখনোবা আড্ডাই হয়ে ওঠে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। গল্পের সঙ্গে চলে গান। কেউ বাঁশি, কেউ গিটার হাতে কিংবা কেউ খালি গলায় বন্ধুদের সঙ্গে এক সুরে তোলে গানের ধুয়া। কারও গানে থাকে প্রেম। এ স্টেশন সাক্ষী হয়ে আছে শত শত প্রণয়ের গল্পের। কতশত চোখ এখানেই প্রথমবারের মতো দেখেছে তার প্রিয় মুখ। প্রথম সাক্ষাৎ, প্রথম প্রস্তাব কিংবা বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল হাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার গল্প শুরু হয়েছে এখানে। এখানে রচিত হয়েছে শত বিচ্ছেদ আর বিরহের গল্প। শেষ সাক্ষাৎ, পরিণয়ে পৌঁছাতে না পারা বেদনাসিক্ত চোখ, দুই ফোঁটা অশ্রু কিংবা ট্রেনের জানালায় শেষবারের মতো প্রিয় মুখ দেখার করুণ গল্পও লেখা আছে এই স্টেশনের আনাচে-কানাচে।
এই স্টেশন যেন এক আবেগ। এক অদৃশ্য মায়ার জালে জড়িয়ে রাখে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের চেয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে এই মায়া অধিকতর রক্তিম হয়ে ফুটে ওঠে। প্রাক্তন হওয়ার পর ক্যাম্পাসে বেড়াতে এলে এই মায়ার প্রতিফলন দেখা যায় তাদের মধ্যে। তেমনই একজন সদ্য প্রাক্তন হওয়া শিক্ষার্থী ভূগোল বিভাগের মনিরুল ইসলাম। ক্যাম্পাস ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো বেড়াতে এসে তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বললেন, এই স্টেশনের প্রতিটি আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমি এখনো অনুভব করি। প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে শাটল থেকে নেমে এ স্টেশনেই পা রেখেছিলাম। মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা। বন্ধুদের সঙ্গে কত গল্প জমিয়েছি! প্রতিটি স্মৃতি আমায় প্রচুর টানে। স্টেশনের এই আড্ডা ছড়িয়ে আছে প্রাক্তন থেকে বর্তমানে, প্রবীণ থেকে নবীনে। এ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম গেয়ে যাওয়া সুর। তেমনই মন্তব্য করেছেন ২০২৪-২৫ সেশনের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী শাদাব ইয়াসিন, এখানে আড্ডা জমানোর বিষয়টি মূলত উত্তরাধিকারসূত্রেই পাওয়া। স্টেশনে সন্ধ্যার আড্ডা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য হিসেবেই ধরতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীর উদ্যোক্তা কিংবা ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন। টিউশনের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে স্বল্প আয়ের মাধ্যম হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীর পছন্দ ক্ষুদ্র ব্যবসা। এসব ব্যবসার কেন্দ্রস্থলও বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই পসরা সাজিয়ে বসেন শিক্ষার্থীরা। কেউ কেউ চা, জলখাবার বিক্রি করেন, কেউ বই, হাতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম, কেউবা জামাকাপড়ের দোকান সাজিয়ে বসেন। এমন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী সাকাওয়াত উল্লা রোহান। তিনি স্টেশন প্ল্যাটফর্মে বই নিয়ে বসেন। এই উদ্যোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, বইয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই বই নিয়ে কাজ করা। স্টেশনে যেহেতু সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয় এবং শিক্ষার্থীরাও এখানে সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে আড্ডা জমান। তাই এ ধরনের বই নিয়ে স্টেশনে বসি।
এমনই আরেকজন বিক্রেতা ২০২২-২৩ সেশনের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তারিকুল ইসলাম। তিনি তার অস্থায়ী স্টলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফুটবল দলের জার্সি বিক্রি করেন। তিনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফুটবল উন্মাদনা প্রচুর। ক্লাব ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ- সবক্ষেত্রেই ছেলেরা প্রিয় দলের জার্সির খোঁজ করে। সেই থেকেই আমার এই ছোট উদ্যোগ।






