ভৈরবের পাড়ে অসহায় নারীদের ঠিকানা

ওল্ড কেয়ার হোমের বারান্দায় আড্ডা দিচ্ছেন মায়েরা (মূল ছবি)। মূল ফটকে জ্যোৎস্না মুখার্জী (ওপরে ডানে)। গল্প-আড্ডা-গানে জ্যোৎস্না মুখার্জী ও প্রবীণ মায়েরা (নিচে)
ভৈরব নদের পাড়ে সমসপুর গ্রামের ওল্ড কেয়ার হোম। সেখানে অসহায় ও স্বজনহারা নারীদের আশ্রয় দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন জ্যোৎস্না মুখার্জী। লিখেছেন যশোর প্রতিনিধি শেখ জালাল
যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে প্রায় ১২ কিলোমিটার এগোলেই মান্দারতলা বাজার। সেখান থেকে পাকা সড়ক ধরে আরও এক কিলোমিটার পশ্চিমে ভৈরব নদ। পূর্ব পাড়ে যশোরের হৈবতপুর ইউনিয়নের সমসপুর গ্রাম। এই গ্রামেই গড়ে উঠেছে অসহায় ও স্বজনহারা প্রবীণ নারীদের এক আশ্রয়— ‘ওল্ড কেয়ার হোম’।
১৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি অসহায় ও স্বজনহারা প্রবীণ নারীদের শেষ জীবনের আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
ওল্ড কেয়ার হোমের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জ্যোৎস্না মুখার্জী। ঝিনাইদহ জেলা মহিলা হ্যান্ডবল দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। পেয়েছেন নানা পুরস্কার।
১৯৮৯ সালে একমাত্র সন্তানের জন্মের দুই বছর পর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে ছেলেকে ভর্তি করান রামকৃষ্ণ মিশনে। পাশেই ব্যারাকপুর, যেখানে গঙ্গা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রম। মিশনে যাওয়া-আসার পথে জ্যোৎস্না মুখার্জী প্রায়ই ঢুঁ দিতেন সেসব আশ্রমে। দেখতে পেতেন, ধনী ও দরিদ্রদের জন্য সেখানে রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। সবাইকে সেখানে অর্থ দিয়েই থাকতে হয়। কৌতূহলে দেখা ব্যারাকপুরের সেই আশ্রমগুলো একসময় তার মনে বুনে দেয় অন্যরকম এক স্বপ্ন। ভাবতে থাকলেন, দেশে ফিরে এমন একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলবেন, যেখানে অসহায় মায়েরা বিনা খরচে থাকতে পারবেন।
কিন্তু দেশে আসার পর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রথম ধাক্কা হয়ে আসে স্বামীর অসুস্থতা। ২০০০ সালে স্বামী অমরনাথ স্ট্রোক করেন। ২০০১ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যশোর সদর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সময়টা কঠিন হয়ে যায় জ্যোৎস্না মুখার্জীর। একসময় তার সেই স্বপ্নও ফিকে হতে থাকে। তবে তিনি থেমে থাকেননি।
তার স্বপ্নের কথা জেনে বাবা বিশ্বনাথ গাঙ্গুলী পাশে এসে দাঁড়ান। ক্যানসারে আক্রান্ত পিতা মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে ২০১০ সালে নিজের পাঁচ বিঘা জমি মেয়েকে দান করেন।
বাবার দেওয়া জমির ২৫ শতকের ওপর জ্যোৎস্না মুখার্জী গড়ে তোলেন ‘ওল্ড কেয়ার হোম’। ২০১৪ সালে নিবন্ধনের আবেদন করার পর ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন পায়।
এল-প্যাটার্নের এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছে ছয়টি কক্ষ। আছে একটি রান্নাঘর। বৃদ্ধাশ্রমের নারীরা মিলেমিশে রান্নার কাজটি করেন। পাশে সেমি পাকা আরও তিনটি কক্ষ রয়েছে। হিন্দু ও মুসলমান নারীদের জন্য রয়েছে পৃথক প্রার্থনার জায়গা।
প্রবীণদের বিনোদনের জন্য রয়েছে দুটি টেলিভিশন। বিদ্যুতের পাশাপাশি আছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা।
বর্তমানে এখানে ২১ জন প্রবীণ নারী বাস করছেন। জ্যোৎস্না মুখার্জীকে ভালোবেসে কেউ ‘মা’, কেউ ‘খালা’ বলে ডাকেন।
ওল্ড কেয়ার হোমের জাহানারা বেগমের বয়স ৬৫ বছর। ১২ বছর ধরে তিনি এখানে আছেন। আলাপকালে বললেন, ‘২০১৩ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেরা আমাকে অবহেলা করত। সেই থেকে এখানে আছি।’
আরেক প্রবীণ নারী সুন্দরী বেগম বললেন, ‘একসময় অনেক কিছু ছিল। এখন কিছুই নেই। ছেলে নিজেই ঠিকমতো চলতে পারে না, আমাকে কীভাবে খাওয়াবে? সব হারিয়ে এখন আমার স্থান এই বৃদ্ধাশ্রম।’
মাঝে মাঝেই সবাইকে নিয়ে আড্ডায় বসেন জ্যোৎস্না মুখার্জী। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলে লুচি, সুজি, ডাল কিংবা মুড়ি-চানাচুর।
প্রতিষ্ঠাতা জ্যোৎস্না মুখার্জীর সঙ্গে আলাপে জানা গেল বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে। তিনি বললেন, ‘কোনো অসহায় ব্যক্তি এখানে এলে প্রথমে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারের অনুমতি নিয়ে একটি ফরম পূরণের মাধ্যমে তাকে আশ্রমে রাখা হয়। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও একজন অভিভাবকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।’
তিনি আরও বললেন, ‘যারা কিছুটা সুস্থ-সবল এবং নিজের কাজটুকু নিজে করতে পারেন, তাদের আমি বিনা পয়সায় গ্রহণ করি।’
ঢাকায় মোবাইল ফোনের ব্যবসা ছিল জ্যোৎস্না মুখার্জীর। সেই ব্যবসার আয় থেকেই বৃদ্ধাশ্রমের খরচ চলত। এখন সেই ব্যবসা নেই। স্থানীয় বাজারে তার ভুসিমালের ব্যবসা রয়েছে। বাজারের একটি বাড়ির তিনটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া আছে। ব্যবসা ও বাড়ি ভাড়ার অর্থ থেকে বৃদ্ধাশ্রমের কিছু ব্যয় বহন করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বৃদ্ধাশ্রমের জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়। রয়েছে ফলের গাছ ও বাঁশঝাড়। এ ছাড়া আছে তিনটি গরু, ৩০ জোড়া কবুতর, ২৫টি মুরগি ও চারটি হাঁস। কৃষি ও গবাদি পশু-পাখি থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যবহার করা হয়।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণ মায়েদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থাই বিনামূল্যে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। জ্যোৎস্না মুখার্জীর আশা, সবার সহযোগিতা পেলে অসহায় মায়েদের নিয়ে এই আশ্রম আরও ভালোভাবে এগিয়ে যাবে।
কেউ যদি ওল্ড কেয়ার হোমের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চান, তবে নিম্নোক্ত অ্যাকাউন্ট নাম্বারে আপনার অর্থ সাহায্য পাঠিয়ে দিতে পারেন-
ওল্ড কেয়ার হোম
হিসাব নম্বর: ২৪০১১০০০১৪৯৪৩
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বারবাজার শাখা, ঝিনাইদহ
যোগাযোগ: ০১৭১৩০৩৪৩৫৩







