টোটো কোম্পানি
ঝরনার নাম তু চু ক্লাইন

তু চু ক্লাইন ঝরনা
বান্দরবানের রুমার তু চু ক্লাইন ঝরনায় যেতে হয় দুর্গম পথ পেরিয়ে। সে গল্প শুনিয়েছেন বাবর আলী
‘তোমরা আজকে যাবে না। আমি কালকে তোমাদের নিয়ে যাব’— পাহাড়ি ঢঙে বলা রেমদার এ কথা শুনেও আমাদের তেমন ভাবান্তর হলো না। যদিও এবার আমাদের হাতে প্রায় ১৪-১৫ দিন সময়, তারপরও আরও এক দিন শুয়ে-বসে কাটানোর বিলাসিতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। এমনিতেই গত কয়েক দিনের অতিরিক্ত বিশ্রামে শরীরে জং ধরে গেছে। তার ওপর এই ভরা বর্ষায় যখন-তখন বৃষ্টির অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি তো আছেই। আজকের দিনটি হালকা মেঘাচ্ছন্ন
খুমিপাড়ার লোকজন খুব একটা বাংলা বোঝে না। কাজ চালানোর মতো বম ও ম্রো ভাষার কিছু বাক্য আমার জানা আছে। কিন্তু খুমি ভাষায় আমার জ্ঞান শূন্য। তাই বমপাড়ার কারবারি দাদার ছেলে কীসব দুর্বোধ্য হরফে একটা চিঠি লিখে আমার হাতে দিয়ে সেটা খুমিপাড়ার গ্রামপ্রধানকে দিতে বলল। ঝরনার পথ চেনে পাড়া থেকে এমন কাউকে আমাদের পথপ্রদর্শক করে পাঠানোর অনুরোধই ছিল তাতে। প্রাতরাশ সারলাম চালকুমড়া আর জুমের লাল চালের ভাত দিয়ে। এরপর
পথের প্রথম অংশটুকু আমাদের চেনা । দলের সবার পায়ে ঘোড়ার তেজ। এবার হাতের বামের ট্রেইল ধরতে হবে। রাস্তা মোটামুটি সোজাই; ভুল করে শুধু জুমের রাস্তায় গিয়ে না পড়লেই হয়। অল্পক্ষণ পরেই খুমিপাড়ার একজন লোকের সঙ্গে দেখা হলো। তার গন্তব্য আমাদের বিপরীত দিকে। অবশ্য সে বিন্দুমাত্র বাংলা বোঝে না। তবে ইশারায় পাড়ার রাস্তাটা ভালোভাবে দেখিয়ে দিল। টানা পা চালিয়ে এবার পাড়ায়।
গ্রামপ্রধানের ছেলেকে খুঁজে বের করে আমাদের উদ্দেশ্য জানাতেই সে পাড়া থেকে ঝরনার পথ চেনে ওরকম কারও খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ পর এক দাদাকে নিয়ে ফিরে আসতেই তাকে সঙ্গী করে ঝরনার পথে নামলাম। প্রথম দিকে শুধু উতরাই আর উতরাই। নামতে নামতেই একসময় পাড়ার ঝিরির মুখে। আনমনে হাঁটছি আর আশপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতেই এগিয়ে চলছি। কানে আসছে নানারকম চেনা-অচেনা পাখির ধ্বনি। অল্পক্ষণ পরেই ঝিরির পথ ছেড়ে পাহাড়ে উঠতে হলো।
একের পর এক পাহাড়। আরও পাহাড়। শুরু হলো সেগুলো ডিঙানোর পালা। এই পথের যেন অন্ত নেই। সামনের মোচড়টা পার হতেই একটা উতরাই। পা বাড়াতেই হাঁটু অবধি দেবে গেল। আরেকটু এগোতেই বুঝলাম, গয়াল চলাচলের রাস্তা এটা। অল্প পথটুকু পেরোতেই বেশ কয়েকটা আছাড় খেতে হলো। উতরাই ছাড়িয়ে সমতলে নামতেই কানে এলো ঝরনার সেই চিরপরিচিত গমগমে শব্দ।
মিনিট দশেক পর পৌঁছে গেলাম ঝরনার ওপরে। এখান থেকে নিচের দিকে নামতে হয়। ঝরনার প্রথম অংশের পানি খানিকটা বেঁকে গিয়ে নিচের পাথুরে ঢালে গড়িয়ে পড়ছে। ওটার তলা দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। ঝরনার তলার অংশটুকু ছোট ছোট পাথরের চাঙড়ে ভর্তি। অল্প পথটুকু পেরিয়ে নিচে নামতেই পূর্ণ বিস্তৃতিতে ধরা দিল ‘তু চু ক্লাইন’ ঝরনার প্রথম ধাপটি। দুই ধাপে ফুট পঞ্চাশেক ওপর থেকে নিচের ঝিরিতে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনার পানি। প্রথম ধাপের
প্রথমটির চেয়ে ফুট বিশেক উঁচু হবে। সরু একটা ফাটলের মধ্য দিয়ে বিপুল জলরাশি পাহাড়ের এবড়োখেবড়ো গা বেয়ে নিচের ঝিরিতে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে। ঠাহর করে দেখলাম, এ ঝরনার এবড়োখেবড়ো গা বেয়ে ওপরে ওঠা সম্ভব। তৎক্ষণাৎ ওপরের দিকে ওঠা শুরু করলাম। সুবিধাজনক একটা খাঁজে গা এলিয়ে দিয়ে সেখানেই ঠায় বসে থাকাতেই পরমানন্দ খুঁজে পেলাম। আমার দেখাদেখি লিটু ভাইও উঠে এলো। তবে রাশিক বেচারা শরীর থেকে জোঁক উদ্ধারকাজেই ব্যস্ত থাকল
কীভাবে যাবেন
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অবস্থান এ ঝরনার। বগা লেক থেকে কেওক্রাডং যাওয়ার সময় ভেতরের পথ ধরতে হবে। স্থানীয় কোনো খুমিকে গাইড হিসেবে নিয়ে যাওয়া যায় তু চু ক্লাইন ঝরনায়।





