ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ড
উপকূল থেকে আলমারিতে

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ড । ছবি: সংগৃহীত
ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিক। শুধু মাছ ধরা নয়, সমুদ্রপাড়ের জীবনযাত্রাকে ঘিরেও গড়ে ওঠা ফ্যাশন ট্রেন্ড। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
কখনো নাবিকদের ডোরাকাটা টি-শার্ট, কখনো সাদা লিনেন, কখনো খড়ের টুপি— সমুদ্র ও উপকূলীয় জীবন বারবারই বদলে দিয়েছে ফ্যাশনের গতিবিধি। চলতি বছর আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় যে ট্রেন্ড ভীষণ আলোচনায়, তাতেও এ দুয়ের ব্যাপক প্রভাব। ট্রেন্ডের নাম ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিক। গত কয়েক বছরে কোস্টাল গ্র্যান্ডমাদার, কোয়াইট লাক্সারি কিংবা মারমেইডকোরের পর এটি চর্চার কেন্দ্রে এসেছে। নাম শুনে মনে হতে পারে এটি শুধুই জেলেদের পোশাকের সরাসরি অনুকরণ। আসলে তা নয়। এটি এমন এক ফ্যাশনধারা, যেখানে আরাম, কার্যকারিতা, প্রাকৃতিক রঙ, টেকসই উপাদান এবং সমুদ্রঘেঁষা মানুষের সরল সৌন্দর্য একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে।
প্রয়োজন থেকেই নান্দনিকতা
উত্তর ইউরোপ, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড কিংবা ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের জেলেদের পোশাক ছিল মূলত প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি। ঠান্ডা বাতাস, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি, দীর্ঘ সময় কাজ— এসব মাথায় রেখেই বানানো হতো। তাই সেখানে ছিল মোটা নিটের সোয়েটার, ঢিলেঢালা শার্ট, শক্ত কাপড়ের ট্রাউজার, জলরোধী জ্যাকেট এবং ব্যবহারিক নকশা। এই বাস্তবধর্মী পোশাক সময়ের সঙ্গে ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। ডিজাইনাররা জেলেদের জীবন থেকে নিয়েছেন রঙ, কাপড়, কাটিং ও অনুষঙ্গ; কিন্তু সেগুলোকে আধুনিক রুচির সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন নতুন রূপ।
ট্রেন্ডের স্বকীয়তা
ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বকীয়তা। এখানে অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে গুরুত্ব পেয়েছে সহজ, পরিমিত ও নান্দনিক নকশা। রঙের ক্ষেত্রে অফ-হোয়াইট, বেইজ, বালুকাময় বাদামি, নেভি ব্লু, সি-গ্রিন, ধূসর, অলিভ, আকাশি কিংবা সমুদ্রের গভীর নীলের প্রাধান্য। এই রঙগুলো চোখে আরাম দেয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করে ভিন্ন মাত্রা। এসব পোশাকে কাপড় হিসেবে ব্যবহৃত হয় লিনেন, কটন, ক্যানভাস, ডেনিম, নিট ও হালকা উল। পোশাক হয়ে থাকে ঢিলেঢালা এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী; ফলে দীর্ঘ সময় পরে থাকা যায় অনায়াসে। শুধু পোশাক নয়, অনুষঙ্গেও এর প্রভাব স্পষ্ট। খড়ের টুপি, ক্যানভাস ব্যাগ, বোনা ঝুড়ি, দড়ির মতো বেল্ট, শামুকের অলংকার, মুক্তার গয়না, চামড়ার স্যান্ডেল এবং রাবারের বুট— সবই এই ট্রেন্ডের অংশ। এখানে গয়নাগুলোও বেশি ভারী হয় না। প্রকৃতির ছোঁয়া থাকায় দেখতেও চমৎকার।
এটি এমন এক ফ্যাশনধারা, যেখানে আরাম, কার্যকারিতা, প্রাকৃতিক রঙ, টেকসই উপাদান এবং সমুদ্রঘেঁষা মানুষের সরল সৌন্দর্য একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে
আলমারিতে যা থাকবে
ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিকের পোশাকের তালিকায় রয়েছে ডোরাকাটা টি-শার্ট, ওভারসাইজ লিনেন শার্ট, সাদা বা অফ-হোয়াইট শার্ট, কটন বা লিনেন ট্রাউজার, কার্গো প্যান্ট, ডেনিম, ক্যানভাস জ্যাকেট, নিট ভেস্ট, ঢিলেঢালা মিডি ড্রেস ও রেইন জ্যাকেট। পোশাকগুলো শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে না; বরং ঢিলেঢালা কাট সবার জন্য মানানসই। লেয়ারিং করা বা স্তরে স্তরে পোশাক পরাও এই ট্রেন্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দেশি আবহাওয়ায়
অনেকেই ভাবতে পারেন, জেলেদের পোশাক কি বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মানাবে? উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’, যদি উপকরণ ও কাপড় নির্বাচন সঠিক হয়। ভারী নিটের বদলে লিনেন, সুতি বা খাদির কাপড় ব্যবহার করা যেতে পারে। ঢিলেঢালা সাদা শার্টের সঙ্গে নীল কটন ট্রাউজার, কিংবা অফ-হোয়াইট কুর্তার সঙ্গে বেইজ প্যান্ট মিলিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় এই ধাঁচের সাজ। নারীদের জন্য কটনের লং ড্রেস, লিনেন শাড়ি, হালকা ওভারশার্ট কিংবা ঢিলেঢালা টিউনিকও এই ধারার সঙ্গে বেশ মানিয়ে যাবে।
দেশীয় ফ্যাশনে নতুন সম্ভাবনা
এই ট্রেন্ডকে পুরোপুরি বিদেশি ভাবার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নদীকেন্দ্রিক জীবন, জেলেদের জাল, নৌকা, ঢেউ, শামুক কিংবা বেতের কারুশিল্প— এসবই আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ। দেশীয় ডিজাইনাররা চাইলে নীল-সাদা রঙ, মাছ ধরার জালের জ্যামিতিক নকশা, দড়ির মোটিফ, বেত ও পাটের অনুষঙ্গ ব্যবহার করে এই আন্তর্জাতিক ধারাকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে নতুন পরিচয় গড়ে তুলতে পারেন।
আন্তর্জাতিক রানওয়ে থেকে দেশের আলমারি
ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিককে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন হাউজগুলো। সাম্প্রতিক সংগ্রহে ইতালীয় ব্র্যান্ড মিউ মিউ ব্যবহার করেছে ডোরাকাটা নটিক্যাল টপ, হালকা নিট, মেরিন-অনুপ্রাণিত সিলুয়েট ও সহজ স্টাইলিং। ফরাসি ব্র্যান্ড ক্লোয়ের সংগ্রহে দেখা গেছে বালুকাময় বেইজ, অফ-হোয়াইট, শৈবাল সবুজ ও সমুদ্রনীলের কোমল রঙ, ঢিলেঢালা লিনেন পোশাক এবং নারীত্বের সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন। অন্যদিকে জাপানি ব্র্যান্ড সাকাই এবং স্প্যানিশ ব্র্যান্ড লোয়েভ এ ধারাকে আরও আধুনিক রূপ দিয়েছে ইউটিলিটি জ্যাকেট, ক্যানভাস, কার্গো পকেট, ওভারসাইজ কাট এবং কারুশিল্পনির্ভর উপাদানের মাধ্যমে।
স্টাইলিং কৌশল
ফিশারম্যান অ্যাস্থেটিক ধারার পোশাকের স্টাইলিংয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে সহজ কিছু নিয়ম। একটি সাদা বা অফ-হোয়াইট লিনেন শার্টের সঙ্গে নেভি বা অলিভ ট্রাউজার, কাঁধে ক্যানভাস টোট ব্যাগ, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল বা লোফার— এ কয়েকটি উপাদানেই তৈরি হয়ে যায় পরিপাটি লুক। নারীরা লিনেন শাড়ির সঙ্গে শামুক বা মুক্তার গয়না, পাট বা বেতের ব্যাগ এবং ন্যূনতম মেকআপ বেছে নিতে পারেন। পুরুষদের জন্য খাদির কুর্তা, ডেনিম বা কটন ট্রাউজার এবং ক্যানভাস জুতা হতে পারে এই ট্রেন্ডের দেশীয় সংস্করণ।
বাংলাদেশি ফ্যাশনপ্রেমীরা এই লুক তৈরির বেশিরভাগ উপকরণ দেশেই পেয়ে যাবেন। লিনেন, খাদি ও সুতি পোশাক মিলবে স্থানীয় ফ্যাশন হাউজগুলোয়। জামদানি বা হ্যান্ডলুম শাড়ি, পাটের ব্যাগ, বেতের ঝুড়ি, ক্যানভাস টোট, শামুক ও মুক্তার গয়না— সবই এখন সহজলভ্য।
ছবি: ইন্টারনেট





