কেন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে হঠাৎ অবসর নিয়েছিলেন কিশোর কুমার?

কিশোর কুমার
তিনি সুরের কোনো ব্যাকরণ বা নোটেশন পড়তে জানতেন না, অথচ এক বছরে ৩০০টি গান রেকর্ড করে ইতিহাস গড়েছিলেন! দেখতে পানের দাগ লাগা সাধারণ এক আমলার মতো হলেও, বলিউডের সবচেয়ে সুন্দরী চার অভিনেত্রীকে প্রেমে ফেলে বিয়ে করেছিলেন তিনি।
তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় গায়ক, আবার একই সাথে সবচেয়ে একাকী এক মানুষ! তিনি আর কেউ নন—উপমহাদেশের সংগীত জগতের সর্বকালের অন্যতম সেরা জাদুকর কিশোর কুমার।
কিশোর কুমারের জন্মদিন আজ। তিনি ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়াতে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৮৫ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে ধরা পড়েছিল ৫৬ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের চূড়ায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ অবসর নেওয়া এবং তার খামখেয়ালী জীবনের নানা অজানা অধ্যায়।
১৯৮৪ সালে পুরো বলিউডে তৈরি ১৫৩টি সিনেমার মোট ৫০০টি গানের মধ্যে ৩০০টিই গেয়েছিলেন কিশোর কুমার। গান প্রতি ৩৫ হাজার রুপি পারিশ্রমিক নিয়ে তখন তিনি সাফল্যের মধ্যগগনে।
কিন্তু ঠিক তখনই দুটি হার্ট অ্যাটাক আর চারটি ঝোড়ো বৈবাহিক জীবনের পর হঠাৎই তিনি ঘোষণা দেন—‘আমি গান ছেড়ে দেব, ফিরে যাব আমার জন্মভূমি মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট শহর খান্ডোয়ায়!’
তার এই ঘোষণায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন সেরা সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মন। কিশোরের জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত—‘সূর্য যখন একদম মাথার ওপর ওঠে, তখন সেখান থেকে কেবল নিচে নামাই নিয়ম। তার চেয়ে আলো থাকতে থাকতেই বিদায় নেওয়া ভালো।’
কিশোর কুমারের আগে সিনেমার গানে সুর হতো বেশ কৃত্রিম। কিন্তু কিশোরই প্রথম অভিনয়কে গানের সাথে মিশিয়ে দেন। ‘ডন’ সিনেমার কালজয়ী গান ‘খাইকে পান বেনারসওয়ালা’ রেকর্ডিংয়ের সময় সত্যিকারের পান মুখে পুরে গেয়েছিলেন তিনি!
আবার ‘শারাবী’ সিনেমার টাইটেল ট্র্যাকে মাতালের নিখুঁত অভিনয় ফুটিয়ে তুলতে কণ্ঠের মধ্যে এনেছিলেন এক মাতাল সুরের টান।
কিশোর কুমারের মেজাজ আর টাকার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে মুখরোচক গল্পের শেষ ছিল না। তার জুহুর মার্বেল পাথরে বাঁধানো রাজপ্রাসাদতুল্য বাংলো ‘গৌরী কুঞ্জ’-এর ড্রয়িংরুমে ফ্রেমে বাঁধানো একটা স্লোগান ঝুলত—‘আই ওয়ান্ট মানি’। এমনকি কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে তার বাড়িতে আয়কর বিভাগ মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে অভিযান চালিয়েছিল।
প্রযোজক মনমোহন দেশাই রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘লোকটার মাথায় শুধু টাকা ঘোরে!’ আবার আশা ভোঁসলে বলতেন, ‘এত বছর ধরে চিনি, অথচ মনে হয় তাকে একটুও চিনি না! তিনি তার নিজস্ব জগতে বাস করেন।’
বাইরে যতই হাসিখুশি আর পাগলটে মানুষ মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে চরম একাকী ছিলেন কিশোর কুমার। ফিল্মি পার্টি বা পারিবারিক অনুষ্ঠান তিনি এড়িয়ে চলতেন।
ছুটির দিনে স্ত্রী লীনা চন্দ্রভারকর ও ছোট ছেলে সুমিতকে নিয়ে নিজের সংগ্রহে থাকা ৩ হাজার ভিডিও ক্যাসেটের খাতা থেকে হরর বা ভৌতিক সিনেমা দেখতেন।
বাংলোর বাগানের ৩০ ফুট লম্বা এক চিনার গাছের নাম তিনি রেখেছিলেন ‘হরি-নিরঞ্জন’। কেউ না থাকলে সেই গাছের সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলতেন কিশোর। তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘হরি-নিরঞ্জন আমার সব টাকা আর ভালোবাসার গোপন রহস্য জানে!’
অভিনেত্রী মধুবালার মৃত্যুর যাতনা কাটাতে তার সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৯ বছর। এরপর যোগিতা বালি এবং পরবর্তীতে লীনা চন্দ্রভারকরের সাথে সংসার। তবে ক্যারিয়ারের একেবারে চূড়ায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ সবকিছু ছেড়ে খান্ডোয়ায় আম গাছের নিচে দোলনায় শুয়ে দিন কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এই সুরের জাদুকর।
তিনি বলতেন—‘আজ আমি সোনা, কিন্তু কাল যদি সিসা হয়ে যাই?’ কিশোর কুমারের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই বাস্তববোধ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে খ্যাতি হারিয়ে ম্লান হয়ে যাওয়ার চেয়ে, সাফল্যের শীর্ষবিন্দুতে থাকা অবস্থাতেই অবসর নেওয়াকে তিনি শ্রেয় মনে করতেন।
কারণ, বৃদ্ধ বয়সে অনুশোচনা আর সময়ের সাথে হারিয়ে যাওয়ার বেদনার চেয়ে, সবাই যখন ভালোবাসছে তখন আলো থাকতে থাকতেই বিদায় নেওয়া অনেক বেশি সম্মানের ছিল তার কাছে।






