কাগজের ফুল কেন ফুটল না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আদম সুরত’ থেকে ‘মাটির ময়না’ ‘রানওয়ে’ তারেক মাসুদের প্রতিটি কাজেই ছিল নিজস্ব ছাপ। কাছ থেকে দেখা সেই তারেকের অজানা গল্পই শোনালেন অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
তারেকের বাবা প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পরে কোনো একসময় তিনি খুব ধার্মিক হয়ে যান। তারেককে মাদ্রাসায় পাঠান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আবার সাধারণ শিক্ষায় ফিরে যায়। তাই মাদ্রাসার ভেতরের জীবন কেমন, সেখানে কী হয়— এসব তারেকের একেবারে নিজের অভিজ্ঞতায় ছিল। ‘মাটির ময়না’র আনু চরিত্রের মধ্যে তারেকের ছেলেবেলার চরিত্রই উঠে এসেছে। ‘মাটির ময়না’য় আমি তারেকের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছি।
‘অন্তর্যাত্রা’র পুরনো বাড়ি
‘অন্তর্যাত্রা’র জন্য পুরান ঢাকার যে পুরনো বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়, বাড়ির মালিক সেটি ভেঙে ফেলবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তারেক অনেক অনুরোধ করে ছয় মাস সময় পিছিয়ে নেয়। বাড়িটি রেনোভেট করে শুটিং করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে মাটি খুঁড়ে একটি পুরনো তুলসীমঞ্চ পাওয়া যায়। তারেক সেই তুলসীমঞ্চকে গল্পের অংশ করে নেয়। উঠোনে ঘাস লাগানো হয়। পুরো উঠোনটাকে এমনভাবে সাজানো হয়, যেন বহু বছর ধরে সেখানে একটি পুরনো বাড়ি ও বাগান রয়েছে। যোগাযোগ করে কলকাতা থেকে বাড়িটির পুরনো মালিকদের আনা হয়েছিল। ‘অন্তর্যাত্রা’তে লক্ষ্মণ দাস নামে যে চরিত্র ছিল, সে বাড়িটি পাহারা দিত। তার মুখে যে ইতিহাস বলা হয়েছে, সেটাও ওই বাড়ির সঙ্গে যাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল, তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। তারেক সেই বাস্তব ইতিহাস গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এই জায়গাতেই তারেক আলাদা।
পানির জন্য নাসায় ফোন
‘মাটির ময়না’তে একটি দৃশ্য ছিল— নৌকা এসে বাড়ির ঘাটে ভিড়বে। কিন্তু নদীতে পানি কম থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছিল না। পরে ক্যাথরিন নাসায় ফোন করেছিল। জানা গেল, ওই এলাকায় নিম্নচাপ আসছে এবং পরদিন থেকে পানির উচ্চতা চার-পাঁচ ফুট বাড়তে পারে। রাত ২টায় তারেক ও ক্যাথরিন আমার বাসায় এসে বলে, ‘জলদি চলেন।’ সেই রাতেই আমরা ছুটলাম। রাতের মধ্যে নৌকায় চড়ে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে সেখানে পৌঁছালাম। ভোরবেলা শুটিং শুরু করলাম। সত্যিই পানি চার-পাঁচ ফুট বেড়ে গিয়েছিল। আমরা সেই পানির মধ্যেই শুটিং করেছিলাম।
‘কাগজের ফুল’ ছিল ‘মাটির ময়না’র সিক্যুয়েল। সিনেমাটির অনেক চরিত্র ছিল বাস্তব মানুষকে কেন্দ্র করে
বিশাল ক্যানভাসের স্বপ্ন
‘কাগজের ফুল’ ছিল ‘মাটির ময়না’র সিক্যুয়েল। খুব বড় একটি প্রকল্প। সিনেমাটির জন্য তারেক অনেক গবেষণা করেছিল। ১৯৪০-এর দশকের ভারত কেমন ছিল, সেটা বোঝার জন্য কলকাতা ও বিভিন্ন জায়গা থেকে ৫২টি বই কিনে এনেছিল। চিত্রনাট্যও সেই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। সিনেমার অনেক চরিত্র ছিল বাস্তব মানুষকে কেন্দ্র করে। তাদের মধ্যে শোভা সেনের চরিত্র ছিল। শম্ভু মিত্র ছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন। আরও অনেক বাস্তব চরিত্র ছিল। নড়াইলের যে জমিদার— তাকেও কেন্দ্র করে একটি চরিত্র রাখা হয়েছিল।
‘কাগজের ফুল’-এর কাস্টিং অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। তারেকের বাবার চরিত্রের তরুণ বয়সের অংশে আমার ছেলে কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় করার কথা ছিল। তারেকের বাবার এক সহপাঠিনীর চরিত্রে কঙ্কনা সেন শর্মা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে জমিদারের চরিত্রে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তারেকের দাদার চরিত্রে আমি ছিলাম।
যশ চোপড়ার সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা
‘কাগজের ফুল’ ছিল বিশাল বাজেটের সিনেমা। আমি তখন মুম্বাইয়ে অন্য একটি কাজে ছিলাম। তারেকরাও তখন মুম্বাই গিয়ে যশ চোপড়ার সঙ্গে দেখা করে। যশ চোপড়া সিনেমাটি প্রযোজনা করতে রাজি হন। এমনকি যৌথ প্রযোজনার চুক্তিও হয়েছিল। এর বাজেট ছিল অনেক বড়। ‘কাগজের ফুল’-এর সেট তৈরি হচ্ছিল মানিকগঞ্জে। জমিদারের নৌকাও তৈরি করা হয়েছিল। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের নৌকার ডিজাইন দেখে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা দিয়ে নৌকাটি বানানো হয়েছিল।
আজীবনের সঙ্গী ক্যাথরিন
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন শুধু জীবনসঙ্গী ছিল তা নয়, সৃজনশীল কাজেরও গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী ছিল। তারেকের প্রায় সব সিনেমার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্যাথরিন। ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিংয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হতেই ক্যাথরিন প্রথম সন্তানসম্ভবা হয়। ফলে শুটিং স্থগিত করে সে যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটে চলে যায়। সন্তান জন্মের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় দেড় বছর পর তারা বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং পুরনো সেট সংস্কার করে আবারও শুটিংয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তারেক ও ক্যাথরিনের ছেলে নিশাদ এখন বিদেশেই বড় হচ্ছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় আমার। বছরের কিছু সময় সে বাংলাদেশেও থাকে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ১৫ বছর।
শুধু ‘কাগজের ফুল’ নয়
তারেকের আরেকটি সিনেমার স্ক্রিপ্টও ছিল। এর প্রেক্ষাপট ছিল সপ্তদশ শতাব্দীর ভারত। স্যার টমাস রো যখন ভারতে এসে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে দক্ষিণ ভারতে একটি কারখানা স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সিনেমাটি অনেক বড় পরিসরে ঐতিহাসিক ক্যানভাসের হওয়ার কথা ছিল। বাজেটও ছিল কয়েকশ কোটি টাকার মতো। একটি বিদেশি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তাও এগিয়েছিল। ‘কাগজের ফুল’ শেষ করার পর এই সিনেমা শুরু করার পরিকল্পনা ছিল।
বাবার মৃত্যুর খবর, তারপর শেষ যাত্রা
তখন কোনো একটি চলচ্চিত্রের শুটিং করছিলাম। তারেক হঠাৎ আমাকে ফোন করল। বলল, তার বাবা মারা গেছেন। সে বাবার দাফন-কাফন করবে, মাকে সময় দেবে, তারপর ঢাকা ফিরবে। এর মধ্যে ‘রানওয়ে’র একটি ওপেন-এয়ার শো ফরিদপুর শহরে হচ্ছে। তিন দিন শো হবে। শো শেষ করে সে ১২ আগস্ট ফিরবে। ১৩ তারিখে আমাদের প্রোডাকশন মিটিং হবে। কিন্তু সেই প্রোডাকশন মিটিং আর হয়নি। এরপর যে দুর্ঘটনা ঘটে, সেটা আমরা সবাই জানি। তারেকও আর ফিরে আসেনি।





