বিষয় চলচ্চিত্র
শন কনারির জেমস বন্ড হয়ে ওঠা

‘ড. নো’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে সহ-অভিনেতার সঙ্গে শন কনারি (ডানে)
৫ অক্টোবর ১৯৬২। লন্ডনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছিল জেমস বন্ড সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ড. নো’র। এর পাঁচ দিন পর বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়। এখানে স্কটিশ অভিনেতা শন কনারির জেমস বন্ড হয়ে ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন রুদ্র আরিফ
‘ড. নো’তে শুরু। এরপর ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’ (১৯৬৩), ‘গোল্ডফিঙ্গার’ (১৯৬৪), ‘থান্ডারবল’ (১৯৬৫), ‘ইউ অনলি লিভ টুয়াইস’ (১৯৬৭), ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভার’ (১৯৭১) ও ‘নেভার সে নেভার অ্যাগেইন’ (১৯৮৩)— ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের সাতটি চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা মিলেছে শন কনারির। ২৫ আগস্ট ১৯৩০ থেকে ৩১ অক্টোবর ২০২০— ৯০ বছরের আয়ুষ্কালে অস্কারজয়ী এ অভিনেতা আরও অনেক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মন জয় করলেও ‘০০৭’ কোডনামধারী ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্টের চরিত্র তাকে বিশেষ করে রেখেছে।
শন করারির জেমস বন্ড হয়ে ওঠার গল্পটাও দারুণ। লন্ডনভিত্তিক লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ‘জেন্টলম্যান’স জার্নাল’ সূত্রে জানা যায়, অভিনয় কখনোই তার প্রথম ভালোবাসা ছিল না। তিনি বরং বডিবিল্ডিং পছন্দ করতেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিলেন; এরপর লাইফগার্ড, শিল্পীর মডেল এবং কফিনের পলিশকারীসহ অদ্ভুত সব কাজ করেছেন। তবে বডিবিল্ডিংয়ের প্রতি অনুরাগ ছাড়েননি। ১৯৫৩ সালে একটি বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তিনি লন্ডনে আসেন। সেখানেই মঞ্চনাটকের জন্য কিংস থিয়েটারের ওপেন অডিশনে অংশ নেন; তারপর প্রথমে কোরাসে জায়গা পান এবং ধীরে ধীরে মূল চরিত্রের বদলি অভিনেতা হিসেবে অবস্থান তৈরি করেন। জন্মগতভাবেই প্রতিভাবান কনারি পরবর্তী এক দশকে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন; যার মধ্যে ১৯৬১ সালের কমেডি ফিল্ম ‘অন দ্য ফিডল’ অন্যতম। সে সময় প্রযোজক হ্যারি সল্টজম্যান এবং অ্যালবার্ট আর. ব্রকলি তাদের নতুন প্রকল্পের জন্য একজন জুতসই অভিনেতা খুঁজছিলেন। চরিত্রটির নাম জেমস বন্ড। এ দুই অভিজ্ঞ প্রযোজক এরই মধ্যে ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জনপ্রিয় ‘০০৭’ উপন্যাসের স্বত্ব কিনে নিয়েছিলেন এবং ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানি ইউনাইটেড আর্টিস্টসের কাছ থেকে এ সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ডক্টর নো’কে বড় পর্দায় আনার অনুমতি পেয়েছিলেন।
অভিনয় কখনোই তার প্রথম ভালোবাসা ছিল না। তিনি বরং বডিবিল্ডিং পছন্দ করতেন
প্রাথমিকভাবে জেমস বন্ড চরিত্রে ৫৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ-আমেরিকান অভিনেতা ক্যারি গ্র্যান্টকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে আরও কয়েকজন অভিনেতাকেও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেসব আলোচনা আলো ছড়ায়নি। তাই শুরু হলো আরও বড় পরিসরে এ সুপার স্পাই চরিত্রের অভিনেতার সন্ধান। চলল অডিশন। এমন সময়ে দৃশ্যপটে হাজির হলেন টগবগে তরুণ কনারি। এক মধ্যাহ্নভোজে ব্রকলি ও সল্টজম্যানের সঙ্গে যোগ দিলেন তিনি। শুরুতে অবশ্য এ দুই প্রযোজকের মন কাড়তে পারেননি; অন্যদিকে লেখক ফ্লেমিং তো তাকে একদমই পছন্দ করেননি। ব্রকলি স্মরণ করেছেন, ইস্ত্রিবিহীন পোশাক পরেই সেদিন রেস্তোরাঁয় হাজির হয়েছিলেন কনারি এবং তাকে বেশ অপরিচ্ছন্ন লাগছিল। কিন্তু ব্রকলির স্ত্রী ডানা ব্রকলি স্বামীকে রাজি করিয়েছিলেন এ স্কটিশ তরুণকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। ৩২ বছর বয়সী কনারি আহারপর্ব শেষে চরিত্রটি নিজের করে নেন। এ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তার কোনো আনুষ্ঠানিক স্ক্রিন-টেস্ট নেওয়া হয়নি। কারণ, ওই দুমড়ানো-মুচড়ানো পোশাক-আশাক সত্ত্বেও তিনি মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে এক দৃঢ়, বেপরোয়া ও পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন; যা প্রযোজকদের কাছে তার যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস ও অভিনয় দক্ষতার সাক্ষ্য দিয়েছিল।
তবে তাকে জেমস বন্ড হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছিল সেদিন রেস্তোরাঁ থেকে তার বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটি। তিনি যখন টেবিল ছেড়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন, সল্টজম্যান ও ব্রকলি জানালা দিয়ে সেই হেঁটে যাওয়া দেখছিলেন, যেটি পরবর্তীকালে ‘জেমস বন্ড’ সিরিজে এজেন্ট ‘০০৭’-এর হাঁটাচলার আদর্শ ভঙ্গিমা হয়ে উঠেছিল। স্মৃতিচারণায় সল্টজম্যান বলেছিলেন, শন করারির চলাফেরা ছিল ঠিক যেন বুনো বিড়ালের মতো। বাকিটা তো ইতিহাস!



