নগদ নারায়ণের নেশা নগদে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার প্রভাববলয়ে প্রতিষ্ঠা পায় দেশের অন্যতম মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম নগদ। নানান অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ডুবতে বসা এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এরপরই নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশাসক। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে টেনে তোলার বদলে এর ওপর বোঝা হয়ে চেপে বসেছেন নতুন প্রশাসকরা। নিজেদের মূল কর্মস্থল থেকে পূর্ণ সুবিধা নেওয়ার পরও সম্মানী, ভাতা বা পারিশ্রমিকের নামে নগদের তহবিল থেকে দেদার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। এ যেন নগদ নারায়ণের নেশা নগদে।
প্রশাসকরা প্রত্যেকেই নিজেদের মূল কর্মস্থল (কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ডাক বিভাগ) থেকে নিয়মিত বেতন ও সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। এর ওপর নগদ থেকে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের ভাতা। এমনকি প্রধান প্রশাসক নিজের ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য নগদের খরচে একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন। নগদকে বাঁচাতে আসা এই ‘ত্রাতা’দের এমন মরিয়া আচরণে প্রতিষ্ঠানটি এখন আরও বেশি সংকটে।
নগদকে ‘লাইফলাইন’ দিতে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে চব্বিশের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মোতাছিম বিল্লাহকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে আগস্টে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী প্রশাসক ও ছয় সহযোগী প্রশাসকও। যাদের ছয়জন বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুজন ডাক বিভাগের কর্মকর্তা। কাছাকাছি সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের ভাই ড. খান আহমেদ সাইদ মুরশিদকে চেয়ারম্যান করে গঠন করা হয় নতুন পরিচালনা পর্ষদ।
অভিযোগ উঠেছে, পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া এই প্রশাসকরা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন নগদ থেকে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিতে। অনেকেই বলছেন, নগদে ‘রক্তচোষা’ হয়ে চেপে বসেছেন তারা। নিজেদের মূল কর্মস্থল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ডাক বিভাগ থেকে বেতনসহ সব সুবিধাই পাচ্ছেন। আবার মুফতে নগদ থেকেও মোটা অঙ্কের মাসিক ‘সম্মানী’, নানান সভার নামে পারিশ্রমিক এবং ইন্স্যুরেন্স ও বিনোদন ভাতার নামে চালাচ্ছেন লুটপাট। প্রশাসক নিজে ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য নগদের খরচে ব্যবহার করছেন একাধিক দামি গাড়ি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠন করা পরিচালনা পর্ষদের পাঁচ সদস্য বোর্ড সভায় উপস্থিত থাকার জন্য সম্মানী নিচ্ছেন ৪৫ হাজার টাকা করে। একাধিক দায়িত্বশীল মাধ্যমে মিলেছে বিস্তর অনিয়মের এসব তথ্য।
জানা গেছে, নগদের প্রশাসকের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ সহযোগী প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন মো. হাবিবুর রহমান। গত মাসে ফেরত গেছেন মূল চাকরিস্থল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এ ছাড়া আবু সাদাত মোহাম্মদ ইয়াছিন, মো. আইয়ুব খান, আনোয়ার উল্লাহ, প্রবাল আহমেদ, খন্দকার শাহীনুর সাব্বির ও এ কে এম মনিরুজ্জামান সহযোগী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা নগদের খরচে বিলাসবহুল গাড়ি সুবিধা ছাড়াও বিভিন্ন খাতে পারিশ্রমিক ও সম্মানী ভাতার নামে লাখ লাখ টাকা তুলে নিচ্ছেন। প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে নগদ কর্তৃপক্ষের পাঠানো নথিতে প্রশাসকের মাসে ৯ লাখ এবং সিনিয়র সহযোগী ও সহযোগী প্রশাসকদের ৫ লাখ টাকা করে ‘গ্রস স্যালারি’ উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পেতে প্রশাসকদের এই হারে মাসিক স্যালারি দেখানো হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নগদের বোর্ড সভার সদস্যরাও পিছিয়ে নেই। এ বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় তৎকালীন উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের ভাই ড. খান আহমেদ সাইদ মুরশিদকে। বোর্ড সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান ড. বজলুল হক খন্দকার, খন্দকার শাখাওয়াত আলী ও মো. আনোয়ার হোসেন। যেকোনো নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিতির জন্য তারা নিচ্ছেন নির্ধারিত হারে সম্মানী।
জানতে চাইলে নগদের প্রশাসক মো. মোতাছিম বিল্লাহ আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডুবতে বসা একটি প্রতিষ্ঠানকে টেনে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সহকর্মীদের নিয়ে সে কাজটা আমি যথাযথভাবে করেছি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান এবং আগের আর্থিক অবস্থা দেখলে যে কেউ তা বুঝতে পারবে। আগে যারা আমাদের পর্যায়ের পদে ছিলেন, তারা ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে বেতন ও সম্মানী নিতেন। সে তুলনায় আমরা অনেক কম সুবিধা ভোগ করছি। আমি মাত্র আড়াই লাখ, সিনিয়র সহযোগী প্রশাসক ২ লাখ ২৫ হাজার এবং সহযোগী প্রশাসকরা ২ লাখ টাকা করে সম্মানী নিচ্ছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষেই তা নেওয়া হচ্ছে। এটি অবৈধ কিছু নয়।’
একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ফিরতে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে বলে দাবি মোতাছিম বিল্লাহর। বললেন, ‘আমি দুটি নয়, নগদের একটি গাড়ি ব্যবহার করি। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী অন্যদের মতো আমিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেতন, গৃহকর্মীর মজুরি ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের টাকা পাই।’
আগামীর সময়ের হাতে আসা নথিপত্রের তথ্যে দেখা গেছে, অফিসের বোর্ড সভায় উপস্থিত বা অফিসের বাইরে নগদের কোনো কার্যক্রম পরিদর্শনে গেলে প্রশাসক ১০ হাজার, সিনিয়র সহযোগী প্রশাসক ৮ হাজার ও সহযোগী প্রশাসক ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা নেন। অফিসের কোনো নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার জন্য সহযোগী প্রশাসক ও বোর্ড সদস্যরা সম্মানী নেন ৬-৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রশাসক নগদের খরচে ব্যবহার করেন প্রাডো ব্র্যান্ডের দুটি পাজেরো গাড়ি। ঢাকা মেট্রো ঘ ১২-৫৯৫২ নম্বরের গাড়িটি মোতাছিম বিল্লাহ নিজে ব্যবহার করেন। আর ঢাকা মেট্রো ঘ ১৫-০২৯০ নম্বরের গাড়িটি ব্যবহার করছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, মোতাছিম বিল্লাহর ব্যবহৃত গাড়িটির মালিকানা নগদের ডেভেলপার বা মূল পরিকল্পনাকারী প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েব টেকনোলজিস লিমিটেডের নামে। আর পরিবারের ব্যবহৃত গাড়িটির মালিকানায় আছে নগদ লিমিটেড। নগদ অফিসের খরচে দুটি গাড়ি ব্যবহারের পরও প্রতিদিন বাইরে যাতায়াতের জন্য আলাদা করে ২ হাজার ২০০ টাকা করে কনভেন্স অ্যালাউন্স বরাদ্দ আছে প্রশাসকের জন্য। এক নথিতে দেখা গেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর এক দিনের পরিদর্শন সম্মানী হিসেবে তিনি নিয়েছেন ৩৬ হাজার টাকা। একই দিনে সিনিয়র সহযোগী প্রশাসক হাবিবুর রহমান ১৪ হাজার ৪০০ ও সহযোগী প্রশাসক এ কে এম মুনিরুজ্জামান নেন ৯ হাজার টাকা করে সম্মানী। মুনিরুজ্জামান নিজেই এই সম্মানীর বিল অনুমোদন দেন। গত বছরের ১৪ অক্টোবর নগদের এক অফিস আদেশে রয়েছে এমন বিস্ময়কর তথ্য।
আরও অবাক করার মতো তথ্য হচ্ছে, নগদের খরচে দুটি গাড়ি ব্যবহারের পরও মোতাছিম বিল্লাহ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তুলছেন গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। গত ১ জুন নগদের প্যাডে বাংলাদেশ ব্যাংকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘নগদ-এ প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমাকে প্রতিষ্ঠানটির বনানী অফিসে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় বিধায় আমার পক্ষে সিস্টেমে প্রতি মাসের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা প্রদানের আবেদন করা সম্ভবপর হবে না। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে আমাকে প্রদেয় মে, ২০২৬-এর গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা আমার কো-অপারেটিভ অ্যাকাউন্টে প্রদান করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।’
এখানেই শেষ নয়। নগদ থেকে মাসে আড়াই লাখ টাকা ‘সম্মানী’সহ বিভিন্ন খাতের বিপুল টাকা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বেতন নিচ্ছেন মোতাছিম বিল্লাহ। জাতীয় বেতন স্কেল গ্রেড-২-এর আওতায় ৬৬ হাজার টাকা স্কেলে সব মিলিয়ে পাচ্ছেন প্রায় দেড় লাখ টাকা। শুধু নিজের বেতন নয়, বাসার গৃহকর্মীর বেতনও নিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। গত ১ জুন নগদের প্যাডে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালককে লেখা মোতাছিম বিল্লাহর আরেক চিঠি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমার বাসায় নিয়োগপ্রাপ্ত দৈনিক মজুরিভিত্তিক গৃহকর্মীর (মোছা. শামছুন্নাহার) মে-২০২৬ মাসের মজুরি বিধি মোতাবেক নিম্নোক্তভাবে আমার কো-অপারেটিভ অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, মতিঝিল অফিসকে অনুরোধ করা যাচ্ছে। দৈনিক ৫৭৫ টাকা হারে ৩১ দিনের মজুরি ১৭ হাজার ৮২৫ টাকা।’
সরকারি দায়িত্ব পালন করে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতনসহ বিপুল সুযোগ-সুবিধা নেওয়া শুধু অনিয়ম নয়, এটি অপরাধ বলে মত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, লুটপাট, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনসহ বহুমাত্রিক অপরাধ। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্তসাপেক্ষে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
যদিও নগদ প্রশাসক মোতাছিম বিল্লাহ মনে করেন, তারা যেসব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন তার কোনোকিছুই অবৈধ নয়। আগামীর সময়ের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘একটি জটিল পরিবেশ, তুলনামূলক দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কাজের ধরনের তুলনায় আমাদের সুবিধা অনেক বেশি নয়। এটি অবৈধ কিছু নয়।’




