শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস, একদিনেই উধাও ৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শেয়ারবাজারে হঠাৎ করেই বড় ধরনের ধস নেমেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে মূল্যসূচকের পতন চললেও চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রবিবার বাজারে দেখা গেছে অস্বাভাবিক দরপতন। একদিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক কমেছে ১০৪ পয়েন্ট। এতে একদিনে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে লেনদেনও কমে নেমে এসেছে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে।
তবে এমন বড় দরপতনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, অর্থনীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যা আগে থেকেই রয়েছে। এসবের মধ্যেই এতদিন শেয়ারবাজারে লেনদেন চলেছে। ফলে রবিবারের আকস্মিক ও ব্যাপক দরপতনের তাৎক্ষণিক কোনো যৌক্তিক কারণ তারা দেখছেন না।
রবিবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০৪ পয়েন্ট বা প্রায় ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সূচকের এমন বড় পতনের ফলে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন কমেছে ৬ হাজার ৭৮১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বলেন, আজকের দরপতনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। তার ভাষায়, দেশের অর্থনৈতিক মন্দা আগে থেকেই রয়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে সরকার কাজ করছে। এসব বিষয়কে রবিবারের পতনের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একই ধরনের মত দিয়েছেন ডিএসইর সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী। তিনি বলেন, দেশের যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো নতুন নয়। এসব সমস্যার মধ্য দিয়েই এতদিন শেয়ারবাজার চলেছে। কিন্তু রবিবারের পতন ছিল ভিন্ন মাত্রার। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বাজারের এই পতনের পেছনে কারসাজির আশঙ্কা করছেন ডিএসইর সাবেক পরিচালক শরীফ আতাউর রহমান। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার আগের তুলনায় সুশাসনের পথে এগোচ্ছে। এতে একটি শ্রেণির মানুষের অবৈধভাবে আয় করার সুযোগ কমে গেছে। তার ধারণা, সেই গোষ্ঠীই হয়তো কৃত্রিমভাবে বাজারে সংকট তৈরি করে থাকতে পারে। এর বাহিরে রবিবারের দরপতনের কোনো যৌক্তিক কারণ তিনি দেখছেন না।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের লেনদেনের চিত্রেও বাজারে অস্থিরতার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স ২ পয়েন্ট বাড়লেও এর আগে বুধবার ২৩ পয়েন্ট এবং মঙ্গলবার ৩৯ পয়েন্ট বেড়েছিল। তবে একই সপ্তাহের রবিবার সূচক কমেছিল ৪১ পয়েন্ট এবং সোমবার কমেছিল আরও ১৬ পয়েন্ট।
এর আগের সপ্তাহেও পতনের প্রবণতা ছিল স্পষ্ট। সপ্তাহের চার কার্যদিবসের মধ্যে বৃহস্পতিবার সূচক ১৬ পয়েন্ট বাড়লেও মঙ্গলবার ৩ পয়েন্ট, সোমবার ৭৯ পয়েন্ট এবং রবিবার ৬৪ পয়েন্ট কমেছিল।
এরও আগে টানা ছয় কার্যদিবসের পতনে ডিএসইএক্স কমেছিল ১৩৪ পয়েন্ট। ওই ধারাবাহিক পতনের পর বৃহস্পতিবার সূচক ১৬ পয়েন্ট বাড়লেও রবিবারের ১০৪ পয়েন্টের ধস বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বড় দরপতনের দিনে ডিএসইতে লেনদেনও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। রবিবার মোট ৫৪৫ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ১৭৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা প্রায় ২৪ শতাংশ।
দিনটিতে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৯টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২০টির বা ৫ দশমিক ১৪ শতাংশের দর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ৩৪৮টির বা ৮৯ দশমিক ৪৬ শতাংশের। আর ২১টির বা ৫ দশমিক ৪০ শতাংশের দর অপরিবর্তিত ছিল।
অর্থাৎ রবিবারের বাজারে দরপতনের চিত্র ছিল প্রায় সর্বব্যাপী। লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ সিকিউরিটিজের দর কমে যাওয়ায় বাজারে বিক্রির চাপের তীব্রতাও স্পষ্ট হয়েছে।
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) রবিবার বড় দরপতন হয়েছে। দিনটিতে সিএসইতে ১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
রবিবার সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২০৪টি কোম্পানির মধ্যে ৩০টির দর বেড়েছে, ১৫৭টির দর কমেছে এবং ১৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭১ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এর আগের কার্যদিবসে সূচকটি কমেছিল ১৪ পয়েন্ট।
ফলে ডিএসই ও সিএসই—দুই বাজারেই রবিবারের লেনদেনে ব্যাপক দরপতন দেখা গেছে। বিশেষ করে ডিএসইতে একদিনে সূচকের ১০৪ পয়েন্ট পতন এবং বাজার মূলধন থেকে প্রায় ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা কমে যাওয়ায় নতুন করে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।






