বাংলাদেশ-সৌদি অর্থনীতি
তেল ও শ্রমের গণ্ডি পেরিয়ে যৌথ বাণিজ্যের নতুন সূর্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত জনশক্তি রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বিশ্ব অর্থনীতির গতিশীল পরিবর্তন এবং সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের এ বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে চলেছে। ঢাকা ও রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে এ সম্পর্ক এখন শুধু সাধারণ পণ্য কেনাবেচায় আটকে নেই। বরং এটি ধাপে ধাপে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং আধুনিক শিল্পভিত্তিক বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী এ দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্যের সামগ্রিক পরিধি আনুমানিক দুই থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে বেশ বড় ধরনের অসংগতি ও ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান। বাংলাদেশ প্রতি বছর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে। এসব আমদানি পণ্যের মধ্যে প্রধানত রয়েছে ক্রুড অয়েল, এলপিজি, রাসায়নিক সার এবং প্লাস্টিক শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষি খাত এবং দ্রুত প্রসারমান ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের চাকা সচল রাখার স্বার্থে এসব উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য।
দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রধানত আমদানিনির্ভর ও অসম হলেও এর মোট পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিন বছর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার (যার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ২৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি), তা পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় আনুমানিক ২.৭ বিলিয়ন ডলারে। হালনাগাদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের আকার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩.৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পাটজাত পণ্য বাবদ রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে একই অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল, রাসায়নিক সার ও প্লাস্টিক কাঁচামাল বাবদ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা দুই দেশের বাণিজ্যে রপ্তানি বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা ও বাণিজ্য ঘাটতির চিত্রকেও স্পষ্ট করে।
আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মূল তালিকায় শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক খাতের নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক। পাশাপাশি হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী, সাধারণ প্লাস্টিক পণ্য এবং পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটজাত দ্রব্যাদিও রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু সৌদি আরব থেকে যে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়, তার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় অনেক কম। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি মূলত থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের দিকেই।
বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সৌদি বিনিয়োগ ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল এবং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ খাতে সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। চট্টগ্রামের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সৌদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এরই মধ্যে ৩০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সৌদি এনার্জি জায়ান্ট ‘আকওয়া পাওয়ার’-এর বিপুল বিনিয়োগ উদ্যোগ দেশের সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিন এনার্জি খাতকে দ্রুত এগিয়ে নেবে। এ ছাড়া যৌথ কারখানা স্থাপন এবং বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিকমানের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ নেওয়ার ক্ষেত্রেও এ নিবিড় অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেশ প্রভাব ফেলছে।
সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসএবিসিসিআই) সভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এখন আর শুধু প্রথাগত তেল আমদানি ও অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। ২০২৭ সালের মধ্যে সৌদি আরবে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রথাগত বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। প্রথাগত পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প, আইটি সেবা, চামড়াজাত পাদুকা এবং আধুনিক পাটজাত পণ্য সৌদি বাজারের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মধ্যপ্রাচ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পরিবেশবান্ধব পণ্যের যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে, বাংলাদেশ তা পূরণে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে বাজারভিত্তিক বাণিজ্যনীতির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূরীকরণ, কার্গো যোগাযোগ স্থাপন এবং বিটুবি নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা গেলে আগামীতে নিশ্চিত হবে দুই দেশেরই বিশাল অর্থনৈতিক অগ্রগতি।



