বকেয়া দাবিতে ঝুলছেন গ্রাহক লভ্যাংশ মালিকপক্ষের পকেটে
- বীমা দাবি বকেয়া ৪,৪১০ কোটি টাকা

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত বীমা কোম্পানিগুলো বছর শেষে শেয়ারহোল্ডারদের হাতে তুলে দিচ্ছে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ। অথচ হাজার হাজার সাধারণ বীমাগ্রহীতার বকেয়া দাবি পরিশোধে নেই উদ্যোগ। মেয়াদের শেষে নিজের জমা করা টাকা ফেরত পেতে এসে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে গ্রাহকদের, মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা অজুহাত আর প্রসেসিংয়ের বাহানার। মালিকপক্ষ নিয়মিত লভ্যাংশ বুঝে পেলেও সাধারণ গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে কোম্পানিগুলোর এই উদাসীনতা পুরো বীমা খাতের বড় বৈষম্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর বীমা দাবি না পেয়ে গ্রাহকের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে।
বীমা ব্যবসার মূলমন্ত্রই হলো গ্রাহকের চরম বিপদে বা চুক্তির মেয়াদ শেষে তার সঞ্চিত আমানতটি নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ভরসার সেই জায়গাটিতে এখন চরম খরা। আইডিআরএর চলতি বছরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের মোট পাওনা জমেছিল প্রায় ৬ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এর মধ্যে ২ হাজার ৪০২ কোটি টাকার সামান্য কিছু পাওনা মেটানো হলেও আটকে রাখা হয়েছে বাকি প্রায় ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রায় ৬৫ শতাংশ গ্রাহকই তাদের মেয়াদপূর্তির টাকা না পেয়ে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। শেয়ারবাজারে যে খাতটি মুনাফার জয়গান গাইছে, বাস্তবে তাদের মাথার ওপর জমা হয়ে রয়েছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি দাবির পাহাড়।
শেয়ারহোল্ডারদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দিলেও বেশ কয়েকটি বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া পড়ে আছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া ন্যাশনাল লাইফের বকেয়া দাবির পরিমাণ ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, আর ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া ডেল্টা লাইফের কাছে গ্রাহকের পাওনা ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া পপুলার ইসলামী লাইফ ২০ শতাংশ লভ্যাংশ দিলেও ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং ১৫ শতাংশ করে লভ্যাংশ দেওয়া মেঘনা লাইফ ও প্রগ্রেসিভ লাইফের কাছে যথাক্রমে ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে এ চিত্রের ব্যতিক্রম হিসেবে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার পাশাপাশি সোনালী লাইফ তাদের বকেয়া বীমা দাবি শূন্যে নামিয়ে এনে শতভাগ দায় পরিশোধের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে।
জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও এস এম নুরুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিগুলোকে প্রধানত দুটি সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়— একটি ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ) এবং অন্যটি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ (বিএসইসি)। দেশের বীমা খাত ও শেয়ারবাজারের সুরক্ষায় এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি। যেসব কোম্পানি গ্রাহকের যুক্তিসংগত মেটাতে ব্যর্থ হবে, তাদের লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমী আগামীর সময়কে বলেছেন, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যে লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়, আইন ও নিয়ম অনুযায়ী সার্বিক হিসাব থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত বা ভ্যালুয়েশনের ৯০ শতাংশ পলিসিহোল্ডার বা বীমা গ্রাহকদের পরিশোধ করে বাকি ১০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। তবে বর্তমানে বকেয়া হিসেবে যে বীমা দাবি রয়েছে, সেগুলো হয়তো বিভিন্ন গ্রাহকের দাখিল করা দাবির সঠিক তদন্ত, নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়াকরণ পর্যায়ে রয়েছে।







