এনবিআর চেয়ারম্যানের সামনে দুই চ্যালেঞ্জ
- কর্মকর্তাদের আস্থা ফেরানোই প্রথম পরীক্ষা

এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব
নতুন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে শুধু অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্য নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মনে করছেন, কর্মকর্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি, বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং উচ্চ সুদহারের প্রভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরের জন্য যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণ করতে সংস্থাটিকে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অথচ গত এক দশকে এনবিআরের গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। ফলে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
চলতি সংকটের পেছনে এনবিআরের সাম্প্রতিক অস্থিরতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের পুনর্গঠনসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করলে কর্মকর্তারা এর বিরোধিতা করে দুই দফা আন্দোলনে নামেন। তাদের অভিযোগ, এনবিআরকে বিভক্ত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর ক্ষমতা প্রশাসন ক্যাডারের হাতে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২৮ ও ২৯ জুন দেশের বিভিন্ন স্থল, সমুদ্র ও বিমানবন্দরে শুল্ক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। পরে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে কয়েক ধাপে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্তত পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, ৩৯ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং প্রায় ৫০০ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়। পরে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়ে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হলেও কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর প্রভাব রাজস্ব আদায়ের ওপরও পড়েছে। ফলে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হতে পারে।
এদিকে কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের দাবির পর কর ক্যাডারের কর্মকর্তা আহসান হাবিবকে এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা এটিকে আন্দোলনের একটি ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখছেন। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসাতে হবে এবং আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল রবিবার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল বৈঠকে এনবিআরের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, অতীতের ঘটনাগুলো পেছনে রেখে রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা সমস্যায় পড়লে এনবিআর তার পাশে থাকবে।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এনবিআরের ভেতর থেকেই চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়া তাদের জন্য বড় একটি সুযোগ; কিন্তু এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার না হলে ভবিষ্যতে এই পদ আবার অন্যদের হাতে চলে যেতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হবে। সেজন্য শুধু মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়, আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মকর্তারা যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান, তাহলে রাজস্ব আদায়ের গতিও বাড়বে।




