আঞ্চলিক নগরায়ণের স্থপতি লতিফ বিশ্বাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিকেন্দ্রীকরণ ও মফস্বল পর্যায়ে পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ণের রূপরেখা কেমন হতে পারে, নব্বই দশকের শুরুতে তা প্রথম দেখিয়েছিলেন ব্যবসায়ী আলহাজ আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। একসময় যখন আবাসন শিল্প বলতেই শুধু ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে বোঝানো হতো, তখন সেই গণ্ডি ভেঙে ঢাকার বাইরে জেলা শহরে বহুতল প্রিমিয়াম আবাসন ও বাণিজ্যিক কাঠামোর ভিত গড়ে তোলেন তিনি। পাবনার মাটিতে রিয়েল এস্টেট শিল্পের বীজ রোপণ করে যে পথচলা তিনি শুরু করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত দেশের আঞ্চলিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
সত্তরের দশক-পরবর্তী বাংলাদেশে স্থানীয় শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে তিনি ব্যবসায়িক জীবন শুরু করলেও তার মূল পরিচিতি গড়ে ওঠে আবাসন খাতের হাত ধরে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘লতিফ রিয়েল এস্টেট লিমিটেড’। সেটি শুধু জেলা পর্যায়ে নতুন ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্থানীয়দের মধ্যে আধুনিক ও নিরাপদ নাগরিক সুবিধার এক নতুন চাহিদাও তৈরি করেছিল। এই দূরদর্শী উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের নিবন্ধিত প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যপদ লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্য দিয়ে মফস্বলের একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়।
পরে ব্যবসার পরিধি বিস্তৃত করে তিনি গড়ে তোলেন বহুমাত্রিক উদ্যোগ ‘লতিফ গ্রুপ অব কোম্পানিজ’। আবাসন ছাড়াও আবাসন অবকাঠামোর সহায়ক ট্রেডিং, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ এবং সাধারণ বাণিজ্যে লতিফ গ্রুপ বিশেষ সুনাম অর্জন করে। ঢাকার বাইরে ব্যবসার পরিধি ধরে রাখার পাশাপাশি রাজধানীর শ্যামলী ও মনসুরাবাদ এলাকাতেও একাধিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গ্রুপটি। তবে লতিফ বিশ্বাসের আসল অবদান নিহিত ছিল স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে। তার এসব উদ্যোগে পাবনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের হাজারো মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রুজিরুটির সংস্থান হয়, যা ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছিল।
শুধু নিজের ব্যবসার বিকাশই নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজকে সংগঠিত করতেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন। দীর্ঘদিন পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করা এবং পাবনা বিসিক শিল্পনগরীর প্রসারে নীতিগত উদ্যোগ নেন। জেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের নানা সংকট জাতীয় ফোরামে তুলে ধরতে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন। ব্যবসায়ের পাশাপাশি মানবিক কাজের অংশ হিসেবে শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণমূলক ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নানা সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে এই অভিজ্ঞ শিল্পপতির জীবনাবসান ঘটে। বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে যেখানে ঢাকামুখী নগরায়ণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে তিন দশক আগেই মফস্বল শহরকে কেন্দ্র করে লতিফ বিশ্বাস যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আজও দেশের আবাসন ও ব্যবসা খাতের জন্য এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মডেল।
আলহাজ আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, নীতিভিত্তিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে পূর্ণ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন। পারিবারিকভাবে তিনি সন্তানদের শুধু পিতৃত্বের স্নেহেই আগলে রাখেননি, বরং তাদের জন্য এক পরম শিক্ষাগুরু ও জীবনসংগ্রামের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সন্তানদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা, সুনির্দিষ্ট সময়ানুবর্তিতা, ধর্মীয় সততা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার যে মূল্যবোধ বুনন করে দিয়েছিলেন, তা-ই আজ তাদের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক জীবনের মূল চালিকাশক্তি। তার মৃত্যুর পরও সেই সুদৃঢ় পারিবারিক শিক্ষা ও আদর্শকে লালন করে এবং তার রেখে যাওয়া স্বপ্ন ও ব্যবসায়িক দর্শনকে ধারণ করেই আজ তার উত্তরসূরিরা লতিফ গ্রুপকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।




